ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ রবিবারের পার্লামেন্ট সেশনে জানিয়েছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক আক্রমণ ঘটে, তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করবে। এই সতর্কতা ইরানের চলমান প্রতিবাদ আন্দোলনের মাঝখানে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেশের বিভিন্ন শহরে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে নাগরিকরা জীবনের ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে।
গালিবাফের মন্তব্য রাষ্ট্র টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরায়েলকে উল্লেখ করে বলেন, ইসরায়েলকে ইরান অবৈধভাবে দখল করা ভূখণ্ড হিসেবে দেখে, তাই তার কোনো সামরিক পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ইরান একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ হলে ইরান কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো নয়, তার শিপিং নেটওয়ার্ককেও লক্ষ্য করবে, যা ইরানের কৌশলগত স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইরানের জাতীয় পুলিশ প্রধান আহমদ-রেজা রাদানও একই দিনে রাত্রিকালীন বড় আকারের গ্রেফতার সম্পর্কে জানিয়ে বলেন, গত শনিবার সন্ধ্যায় প্রতিবাদে জড়িত প্রধান ব্যক্তিত্বদের ওপর ব্যাপক গ্রেফতার করা হয়েছে। রাদান উল্লেখ করেন, গ্রেফতারের পর তাদের আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হবে এবং এই পদক্ষেপটি দেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অপরিহার্য। তবে তিনি গ্রেফতারের সংখ্যা বা গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ না করে, কেবলমাত্র এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন যে নিরাপত্তা সংস্থা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রবিবারের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও জনগণের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলমান প্রতিবাদে নাগরিকরা মূলত জীবনের ব্যয়বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, সরকার সাবসিডি সংস্কারসহ বৃহৎ অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা চালু করেছে, যা জনগণের আর্থিক বোঝা কমাতে লক্ষ্যবদ্ধ। তিনি আরও বলেন, সরকার জনগণের চাহিদা শোনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সাক্ষাৎকারে দেবেন, যা একই দিন পরে সম্প্রচারিত হবে।
প্রতিবাদ আন্দোলনটি মূলত জ্বালানি, খাবার ও মৌলিক পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ার ফলে উদ্ভূত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে তেহরানের বিভিন্ন মোহল্লায় এবং অন্যান্য বড় শহরে বিশাল জনসমাবেশ দেখা গেছে, যেখানে কর্মী, ছাত্র ও গৃহিণীরা একত্রে সরকারের নীতি সমালোচনা করেছে। সরকার এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিবেচনা করে, বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য পণ্যের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিকল্পনা করেছে, তবে প্রতিবাদকারীরা দাবি করছেন, এই পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয় এবং দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
গালিবাফের সতর্কবার্তা এবং রাদানের গ্রেফতার ঘোষণার পাশাপাশি পেজেশকিয়ানের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা ইরানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মোড় আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, গালিবাফের মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে কোনো সামরিক সংঘর্ষের ক্ষেত্রে ইরান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। দেশীয়ভাবে, বড় আকারের গ্রেফতার এবং অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা সরকারের কঠোর অবস্থানকে প্রকাশ করে, তবে একই সঙ্গে জনগণের উচ্চ প্রত্যাশা ও অসন্তোষকে তীব্র করে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ে, তবে ইরানের নিরাপত্তা নীতি ও অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা উভয়ই বড় পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে।
এই ঘটনাগুলো ইরানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুনর্গঠন করার সম্ভাবনা রাখে, যেখানে সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপের মোকাবিলা করতে হবে এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রতিবাদকারীদের দাবি ও সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে সমন্বয় না হলে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে, যা দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।



