অবসরপ্রাপ্ত বাণিজ্য মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী রবিবার চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউ হোটেলে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রিকতা সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাজধানী ঢাকা হওয়ায় দেশের বেশিরভাগ কার্যক্রম ধীরে ধীরে ঢাকার দিকে সরে গেছে এবং এই প্রবণতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
বৈঠকের আয়োজন প্রথম আলো করেছে এবং এতে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড, আবুল খায়ের গ্রুপ ও টিকে গ্রুপের সহায়তা রয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের সামনে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কী কী পদক্ষেপ দরকার, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। খসরু চৌধুরী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম দূরত্ব কমাতে এক্সপ্রেসওয়ে সম্পন্ন হলে যাত্রা সময় অর্ধেক হয়ে যাবে, যা ব্যবসায়িক পরিবহনকে ত্বরান্বিত করবে।
মন্ত্রীর মতে, দেশের বেশিরভাগ কাজ এখনো শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া সম্পন্ন হয় না, বিশেষ করে ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তির জন্য ঢাকা যেতে বাধ্য করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত দেশগুলোতে প্রায় সব সেবা অনলাইনে সরবরাহ করা হয়, আর বাংলাদেশে এই দিকটি এখনও পিছিয়ে আছে। তাই তিনি প্রস্তাব করেন, সরকারী সেবা ডিজিটালাইজেশন দ্রুততর করে নাগরিকদের ঢাকা ছাড়াই প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে হবে।
চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র বানাতে হলে নিয়ন্ত্রণমুক্ত (ডিরেগুলেটেড) পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, এ কথায় তিনি জোর দেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, যখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়, তখন অন্য অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ ও উদ্যোগের সুযোগ কমে যায়। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটলে স্থানীয় সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে, ফলে আমলাতন্ত্রের অতিরিক্ত জটিলতা কমে যাবে এবং জনগণের হাতে অধিক ক্ষমতা আসবে।
খসরু চৌধুরী আরও বলেন, চট্টগ্রামের সমুদ্রতটের সুবিধা ব্যবহার করে এটিকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বেশিরভাগই সমুদ্রপথে নির্ভরশীল, তাই চট্টগ্রামের উপকূলীয় অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমকে সহজ করা দরকার। এ জন্য বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল ও সড়ক সংযোগ বাড়ানো এবং আধুনিক গুদাম সুবিধা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়িক নেতারা চট্টগ্রামের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঢাকায় উপস্থিতি কমাতে সরকারী নীতি পরিবর্তনের দাবি করেন। তারা উল্লেখ করেন, বড় ব্যবসায়ীরা যদি চট্টগ্রামে থেকেই তাদের কার্যক্রম চালাতে পারেন, তবে অর্থনৈতিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে শহরের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে। এ ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ কেবল চট্টগ্রামের নয়, সমগ্র দেশের উন্নয়নে সহায়ক হবে।
মন্ত্রীর বক্তব্যের ভিত্তিতে তিনি একটি তালিকা প্রস্তুত করার পরামর্শ দেন, যাতে ঢাকা না গিয়ে কী কী কাজ করা যায় তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। তিনি বিশ্বাস করেন, এমন একটি তালিকা দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান বের করতে সহায়তা করবে। এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, দেশের উন্নত দেশগুলোর মতোই বাংলাদেশে এখনো অনেক সেবা অনলাইন করা বাকি, এবং তা দ্রুত সম্পন্ন করা দরকার।
বৈঠকের শেষে অংশগ্রহণকারীরা চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি, অবকাঠামো এবং আইনি সংস্কারের বিষয়ে সম্মত হন। তারা একমত হন যে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ কমিয়ে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদে দেশের সমগ্র উন্নয়নের চাবিকাঠি।
এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে, সরকারকে চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজ, কর ছাড় এবং বিনিয়োগের সুবিধা প্রদান করতে হবে বলে মত প্রকাশ করা হয়। এছাড়া, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা এবং একাধিক স্তরে অনুমোদন প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, আমীর খসরু চৌধুরীর বক্তব্য চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্রীয় ক্ষমতা হ্রাস, ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রক পরিবেশের সংস্কারকে মূল অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। তার মতে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে চট্টগ্রাম শুধু বাণিজ্যিক রাজধানী নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



