ঢাকা, রবিবার—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলার সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশদ মন্তব্য করেন। তিনি রাজধানীর একটি হোটেলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘এমক্যাশ’ রিব্র্যান্ডিং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই কথা বলেন।
গভর্নর উল্লেখ করেন, যদি দেশব্যাপী নগদবিহীন লেনদেনের কাঠামো সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বছরে অতিরিক্ত ১.৫ থেকে ২ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব। এই অনুমান বর্তমান আর্থিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং নগদহীনতা থেকে সৃষ্ট কর, ফি ও অন্যান্য সরকারি আয়ের বৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
এ ধরনের আর্থিক রূপান্তর কেবল রাজস্ব বাড়াবে না, দুর্নীতির হার হ্রাসেরও সম্ভাবনা রয়েছে। নগদ লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়লে গোপনীয়ভাবে সম্পদ সঞ্চয় ও অনিয়মিত অর্থপ্রবাহ কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে সরকারি তহবিলের ব্যবহার আরও কার্যকরী হবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টরের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভর্নর স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি জোর দেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোকে শারিয়াহ নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা আবশ্যক, যাতে গ্রাহক ও ব্যাংকের উভয়ের স্বার্থ রক্ষা পায়। শারিয়াহ মান্যতা না করলে সেক্টরের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা কমে যাবে।
গভর্নর আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইসলামী ব্যাংকে শারিয়াহ লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এই বিষয়টি সংশোধনের জন্য শীঘ্রই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শারিয়াহ মান্যতা নিশ্চিত করা এবং লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের উপর কঠোর শাস্তি আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার ব্যাংকিং শিল্পের কাঠামোকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন। নগদবিহীন লেনদেনের বাড়তি ব্যবহার ব্যাংকগুলোর লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্ট, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং গ্রাহক সেবা পদ্ধতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে। একই সঙ্গে ফিনটেক স্টার্টআপ ও মোবাইল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের জন্য বাজারের সুযোগও প্রসারিত হবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য অতিরিক্ত আয় সৃষ্টির পাশাপাশি খরচ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করে। ইলেকট্রনিক ট্রান্সফার, QR কোড পেমেন্ট এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের ব্যবহার বাড়লে অপারেশনাল খরচ হ্রাস পাবে, যা শেষ পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে এই রূপান্তরের সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও যুক্ত। সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা গোপনীয়তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা না হলে সিস্টেমে আঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। এছাড়া গ্রামীণ ও কম ডিজিটাল সচেতন জনগোষ্ঠীর জন্য নগদবিহীন সেবার প্রবেশযোগ্যতা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়ে যাবে।
সারসংক্ষেপে, ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের আর্থিক রাজস্বে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, দুর্নীতি হ্রাস এবং ব্যাংকিং সেক্টরের আধুনিকায়ন সম্ভব। তবে শারিয়াহ মান্যতা নিশ্চিত করা, আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করে এই রূপান্তরের ঝুঁকি কমিয়ে সুযোগকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা দরকার।



