ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয় ও তার অধীনস্থ সংস্থাগুলো ২১টিরও বেশি প্রশিক্ষণ প্রকল্প চালু করেছে। এ প্রকল্পগুলোর মধ্যে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলইডিপি) বিশেষভাবে নজরে এসেছে, যেখানে শীর্ষ ফ্রিল্যান্সারদের ল্যাপটপ প্রদান এবং ৪০ হাজার ফ্রিল্যান্সার গড়ে তোলার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল।
প্রকল্পের মূল নীতিমালা ছিল মেধা ভিত্তিক পুরস্কার, তবে গোপন চিঠি মাধ্যমে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে শর্ত আরোপ করা হয় যে, পুরস্কারপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা হবে। এই চিঠিগুলোতে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল যে, যেসব প্রার্থীর ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ কর্মকাণ্ডের কোনো ইঙ্গিত আছে বা যারা আওয়ামী লীগের বাইরের কোনো দলীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তারা পুরস্কার পাবে না।
শর্তের বাস্তবায়ন মানে ছিল রাজনৈতিক পরিচয়কে যোগ্যতার মানদণ্ডে রূপান্তরিত করা, ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—ফ্রিল্যান্সার দক্ষতা বৃদ্ধি—প্রায়ই পেছনে ধাক্কা খায়। গবেষক নিয়াজ আসাদুল্লাহ ও চৌধুরী মফিজুর রহমানের নেতৃত্বে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যায়, এই ধরনের রাজনৈতিক ফিল্টারিং প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতাকে ক্ষুণ্ন করেছে।
আইসিটি মন্ত্রণালয় ৮ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) প্রকাশিত শ্বেতপত্রে উল্লেখ করেছে, ‘ফ্রিল্যান্সার বিপ্লব’ এবং ‘আইটি জনশক্তি’ গড়ার দাবি বেশিরভাগই কল্পিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। প্রকৃত উপস্থিতি রেজিস্টার ও হাজিরা তালিকায় ফাঁকা স্থান পূরণ করতে ভুয়া এন্ট্রি তৈরি করা হয়েছে, এবং প্রকল্পের তহবিলের বড় অংশ রাজনৈতিক লুটপাটের আকারে ব্যবহার করা হয়েছে বলে গবেষণায় রেকর্ড আছে।
প্রশিক্ষণ প্রকল্পের আর্থিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। ২০১৬ সালের পর থেকে প্রশিক্ষণ ধুম শুরু হলেও, ২০২২ পর্যন্ত আইসিটি বিভাগের হাতে মোট ১৯টি প্রকল্পে প্রায় ৯,৪৬৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এই ব্যয়ের বেশিরভাগই সরাসরি প্রশিক্ষণ উপকরণ, ল্যাব, সফটওয়্যার লাইসেন্স এবং প্রশিক্ষক ভাতা হিসেবে গৃহীত হয়েছে, তবে তহবিলের ব্যবহার ও ফলাফল নিয়ে স্বচ্ছতা কম।
এলইডিপি প্রকল্পের অন্যতম বড় অংশ ছিল শীর্ষ ফ্রিল্যান্সারদের ল্যাপটপ বিতরণ। যদিও ড্যাশবোর্ডে সাফল্যের গল্প প্রচার করা হয়, বাস্তবে ল্যাপটপের বিতরণ ও ব্যবহার পর্যবেক্ষণে বড় ঘাটতি দেখা যায়। তদুপরি, ভেন্ডরদের পেমেন্টের শর্ত ছিল প্রশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান বা আয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা প্রকৃত কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হলেও পেমেন্ট নিশ্চিত করার জন্য কৃত্রিম উপায় তৈরি করেছে।
এই শর্তের ফলে ভেন্ডররা প্রশিক্ষণ শেষে তৎক্ষণাৎ ‘কৃত্রিম আয়’ তৈরি করে বা প্রশিক্ষণার্থীদের অস্থায়ী কাজের মাধ্যমে পেমেন্টের ভিত্তি গড়ে তুলতে বাধ্য হয়। ফলে প্রকৃত ফ্রিল্যান্সার দক্ষতা উন্নয়নের বদলে আর্থিক লেনদেনের গতি বাড়ে, এবং প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনে বড় ফাঁক থাকে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রচারণার ছায়ায় চলা এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয় এবং প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার মানদণ্ডে পার্টি সংযুক্তি প্রধান ভূমিকা পালন করে।
এই পরিস্থিতি আইসিটি খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, কারণ দক্ষ ফ্রিল্যান্সার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা ও merit‑based সিস্টেমের অভাব রয়েছে। তদুপরি, সরকারি তহবিলের অপব্যবহার ও রাজনৈতিক লুটপাটের অভিযোগ আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারে।
প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও ফলাফল উন্নত করতে এখনই প্রয়োজন মেধা ভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি পুনর্গঠন, তহবিলের ব্যবহার পর্যবেক্ষণের জন্য স্বতন্ত্র অডিট ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো। এধরনের পদক্ষেপ না নিলে, ভবিষ্যতে ফ্রিল্যান্সার প্রশিক্ষণ ও আইটি মানবসম্পদ গঠনের লক্ষ্য পূরণে বড় বাধা সৃষ্টি হবে।



