ঢাকায় অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় নীতি সংলাপ (CPD) এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেন, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে বিনিয়োগ বাড়ানো ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
বিনিয়োগের অভাবের ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে না, আয় স্থবির থাকবে এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়বে, এ কারণেই বিনিয়োগকে অগ্রগণ্য করা জরুরি। বর্তমান সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, ফলে বাস্তব মজুরি হ্রাস পেয়েছে, যা কর্মশক্তির ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তার পরিবেশে শক্তিশালী বিনিয়োগ প্রবাহের সম্ভাবনা সীমিত। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলি—যেমন অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, নীতি অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক জটিলতা, ভারী কর নীতি, উচ্চ অর্থায়ন খরচ এবং চুক্তি প্রয়োগের দুর্বলতা—নতুন বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে।
শক্তি সরবরাহের ঘাটতি, বিশেষত গ্যাসের ঘন ঘন বিচ্ছিন্নতা, শিল্প উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে। এই ঘাটতি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করে। একই সঙ্গে, শক্তি সরবরাহের হ্রাস, মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চতর অর্থায়ন খরচ মিলিয়ে ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে।
পরবর্তী সরকারকে লিডেড ডেভেলপড কান্ট্রি (LDC) থেকে মুক্তির জন্য প্রস্তুত করা ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ (STS) এর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এই কৌশলটি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে সমর্থন করার পাশাপাশি বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোর ডিজিটালাইজেশন ও স্বয়ংক্রিয়করণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
ইন্টারিম সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং বেশিরভাগ ম্যাক্রোইকোনমিক সূচকের অবনতি দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারকে আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং মুদ্রা বাজারের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ স্থিতিশীল করা, রোড ও রেল নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ, এবং লজিস্টিক্সের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। এসব পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করবে।
কর নীতির পুনর্বিবেচনা, বিশেষত করের বোঝা হ্রাস এবং কর সংগ্রহের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ব্যবসার পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। একই সঙ্গে, ঋণগ্রহণের খরচ কমাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে সুদের হার হ্রাসের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
চুক্তি প্রয়োগের শক্তিশালীকরণ এবং আইনি কাঠামোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ার সরলীকরণও গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল সেবা ও স্বয়ংক্রিয় পোর্টাল চালু করা হলে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত হবে, যা বিনিয়োগের সময়সীমা কমিয়ে দেবে। এ ধরনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ব্যবসায়িক খরচ কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে, মূল পণ্য ও সেবার মূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মূল্য নিয়ন্ত্রণ নীতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের উন্নতি জরুরি। একই সঙ্গে, মুদ্রা নীতি সমন্বয় করে মুদ্রার মান স্থিতিশীল করা হবে।
সারসংক্ষেপে, পরবর্তী সরকারের জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, শক্তি সরবরাহ স্থিতিশীলতা, কর ও আর্থিক নীতির সংস্কার, এবং ডিজিটাল সেবার প্রসারই মূল অগ্রাধিকার। এই পদক্ষেপগুলোই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে সামাজিক সমতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।



