বাংলাদেশের প্রস্তুত পোশাক রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে, যা দেশের সর্ববৃহৎ একক বাজার, জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৭.০৮ বিলিয়ন ডলার রেকর্ড করেছে। এই বৃদ্ধি বছর-ও-বছর তুলনায় উল্লেখযোগ্য এবং দেশের রপ্তানি আয়কে শক্তিশালী করেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, এই উত্থান মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের পারস্পরিক শুল্ক নীতি কার্যকর হওয়ার আগে শিপমেন্টের অগ্রিম চালান বাড়ার ফলে ঘটেছে। রপ্তানিকারকরা কম শুল্কের সময়ে বড় অর্ডার গ্রহণ করে মোট রপ্তানি পরিমাণকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি করে তুলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ব্যবস্থা এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাময়িকভাবে ১০ শতাংশের বেসলাইন শুল্ক আরোপ করে, যা পূর্বের ১৬ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মোট প্রায় ২৬ শতাংশের হার তৈরি করে। এরপর আগস্ট ৭ তারিখে দেশ-নির্দিষ্ট উচ্চ শুল্ক কার্যকর হয়, যা রপ্তানির খরচকে বাড়িয়ে দেয়।
বেসলাইন শুল্কের নিম্ন সময়কালে আমেরিকান ক্রেতারা বড় পরিমাণে পণ্য সংগ্রহ করে, ফলে জানুয়ারি-অক্টোবরের শিপমেন্টের পরিমাণ স্বাভাবিকের উপরে উঠে যায়। এই অস্থায়ী উত্সাহ বাকি বছরের মৌলিক প্রবণতাকে কিছুটা ঢেকে রাখে।
প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে এপ্রিল মাসে ৩৫ শতাংশের পারস্পরিক শুল্কের মুখোমুখি হতে বলা হয়েছিল, তবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর এই হার ২০ শতাংশে কমানো হয়। শুল্ক হ্রাস রপ্তানিকারকদের জন্য আর্থিক চাপ কমিয়ে দেয় এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
এই রপ্তানি বৃদ্ধির পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল পোশাক বাজার সামগ্রিকভাবে স্থবির ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি ০.৬১ শতাংশ কমে ৬৬.৬৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা অফিস অফ টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (OTEXA) এর তথ্য অনুযায়ী।
অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোও একই সময়ে মার্কিন বাজারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভিয়েতনাম ১১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪.১৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে, ভারত ৮.৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৪.৩৯ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তান ১২.৩ শতাংশ বাড়িয়ে ২.০২ বিলিয়ন ডলার, ইন্দোনেশিয়া ১০.১ শতাংশ বাড়িয়ে ৩.৯৮ বিলিয়ন ডলার এবং কম্বোডিয়া ২৫.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪.০৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে।
চীনের ক্ষেত্রে বিপরীত প্রবণতা দেখা যায়; শুল্ক এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের ফলে রপ্তানি ৩২.৪ শতাংশ কমে ৯.৪৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এই পার্থক্য অঞ্চলীয় প্রতিযোগিতার তীব্রতা এবং নীতি পরিবর্তনের প্রভাবকে তুলে ধরে।
OTEXA অনুযায়ী, এই সময়কালে বাংলাদেশী পোশাকের ইউনিট মূল্য সামান্য হ্রাস পেয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রিটেইলারদের সতর্ক ক্রয় আচরণের ফলাফল। দাম কমলেও পরিমাণে বৃদ্ধি সামগ্রিক আয়কে সমর্থন করেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রপ্তানি পরিমাণের এই উত্থান দেশের গার্মেন্টস শিল্পের নগদ প্রবাহকে শক্তিশালী করেছে এবং উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে শুল্কের পরিবর্তন এবং ভোক্তাদের চাহিদার অস্থিরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আসন্ন সময়ে যদি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি পুনরায় কঠোর হয় অথবা ভোক্তাদের ব্যয়বহুল পণ্য ক্রয়ের প্রবণতা হ্রাস পায়, তবে রপ্তানি বৃদ্ধির গতি ধীর হতে পারে। একই সঙ্গে, ইউনিট মূল্যের হ্রাস বজায় থাকলে মুনাফার মার্জিন সংকুচিত হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, জানুয়ারি-অক্টোবরের সময়কালে বাংলাদেশী গার্মেন্টস রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মূলত শুল্কের অস্থায়ী হ্রাস এবং অগ্রিম শিপমেন্টের ফলে ঘটেছে। যদিও বাজারের সামগ্রিক চিত্র স্থবির, তবে অন্যান্য দেশগুলোরও সমান বৃদ্ধি রপ্তানির বৈশ্বিক প্রবণতাকে নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে শুল্ক নীতি এবং আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিবর্তন রপ্তানি পারফরম্যান্সের মূল নির্ধারক হবে।



