আলেপ্পো, ১১ জানুয়ারি (সোমবার) – সিরিয়ার কুর্দি গোষ্ঠী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (SDF) সরকারী সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে চুক্তি অনুসারে আলেপ্পোর কিছু কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত পাড়া থেকে প্রত্যাহার করেছে। চুক্তি অনুযায়ী শীঘ্রই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং শিহর মাকসুদ ও আশরাফিয়েহ পাড়ার বাসগুলোকে উত্তরে ও পূর্বে অবস্থিত কুর্দি অঞ্চলগুলিতে পাঠানো হবে।
সিরিয়ার সরকারী সেনাবাহিনী কয়েক ঘণ্টা আগে শিহর মাকসুদ পাড়া থেকে সামরিক কার্যক্রম শেষ করার ঘোষণা দেয়। রাষ্ট্র টেলিভিশন জানায়, আত্মসমর্পণকারী কুর্দি যোদ্ধাদেরকে বাসে করে উত্তরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একই সময়ে, সরকার ইতিমধ্যে আলেপ্পোর আরেকটি কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত পাড়া, আশরাফিয়েহ, দখল করার কথা জানিয়ে দেয়।
আলেপ্পোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে কুর্দি গোষ্ঠীর কিছু অংশে নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং উত্তর ও উত্তর-পূর্বে তারা একটি প্রায় স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন গড়ে তুলেছে, যা ১৪ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময় অর্জিত। তবে কুর্দি গোষ্ঠীকে দেশের নতুন সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় সাম্প্রতিক সংঘর্ষ তীব্রতর হয়।
SDF একটি প্রকাশ্য বিবৃতিতে জানায়, “একটি পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়েছে এবং শিহর মাকসুদ ও আশরাফিয়েহ পাড়া থেকে শহীদ, আহত, ফাঁদে আটকে থাকা নাগরিক এবং যোদ্ধাদের উত্তরে ও পূর্বে নিরাপদে স্থানান্তর নিশ্চিত করা হয়েছে।” এই বিবৃতি থেকে স্পষ্ট যে, কুর্দি গোষ্ঠী এখনো সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার না করেও, মানবিক রেহাই নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
সরকারি সংবাদ সংস্থা সানা জানায়, শিহর মাকসুদ পাড়া থেকে শেষ ব্যাচের SDF সদস্যদের নিয়ে গঠিত বাসগুলো ইতিমধ্যে উত্তরের দিকে রওনা হয়েছে। সংস্থা উল্লেখ করে, এই বাসগুলো কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পৌঁছাবে।
প্রাথমিকভাবে SDF এই বাস চলাচলকে নাগরিকদের জোরপূর্বক স্থানান্তর হিসেবে বিবেচনা করে অস্বীকার করেছিল। তবে পরবর্তীতে তারা স্বীকার করে যে, এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের সমর্থনে গৃহীত হয়েছে, যা কুর্দি জনগণের ওপর আক্রমণ ও লঙ্ঘন থামাতে সহায়তা করবে।
একজন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এফপি সংস্থার মাধ্যমে জানায়, শনিবার শিহর মাকসুদ পাড়া থেকে কমপক্ষে পাঁচটি বাস বেরিয়ে গিয়েছিল, তবে যাত্রীদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এই তথ্যের ভিত্তিতে, স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করে যে, বাসগুলোতে মূলত যোদ্ধা ও তাদের পরিবারিক সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত।
সংঘর্ষের পটভূমিতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই সিরিয়ার সরকার ও কুর্দি কর্তৃপক্ষকে রাজনৈতিক সংলাপ পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে, কুর্দি গোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন ও দেশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি।
এই সংঘর্ষের সময়, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪-এ বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর থেকে সবচেয়ে তীব্র যুদ্ধের একটি রেকর্ড গড়ে উঠেছে। সিরিয়ার সরকারী সূত্র অনুযায়ী, কমপক্ষে ২১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। আহতের সংখ্যা ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির পরিমাণ এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়নি।
আলেপ্পোর কুর্দি পাড়া থেকে প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি, সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি কতটা টেকসই হবে তা নির্ভর করবে কুর্দি গোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন ও সিরিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের পুনর্নির্মাণের ওপর।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা পুনরায় আলোচনার সূচনা করতে পারে, যেখানে কুর্দি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বীকৃতি, নিরাপত্তা গ্যারান্টি এবং মানবিক সহায়তার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে। সিরিয়ার ভবিষ্যৎ গঠন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য এই ধাপটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।



