ঢাকা, শনিবার – কেন্দ্র ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজন করা ‘রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক নীতি‑সংলাপে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সরকারী কাজের সমালোচনা ও স্বীকৃতির সমন্বিত পদ্ধতি প্রস্তাব করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার দশটি কাজের মধ্যে চারটি সাফল্য অর্জন করলে তা স্বীকৃতির যোগ্য, আর বাকি ছয়টি কাজের সমালোচনা করা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, তবে সম্পূর্ণ ব্যর্থতা দাবি করা সৎ সমালোচনার সীমা অতিক্রম করে।
ড. আসিফের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল সংস্কার‑কেন্দ্রিক পদক্ষেপগুলোর মূল্যায়ন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পদোন্নতি, বদলি, বাজেট বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সব ক্ষমতা উচ্চ আদালতে হস্তান্তর করা হয়েছে, যা তিনি সংস্কার হিসেবে উল্লেখ করেন। গুম কমিশনের গঠন ও তার কার্যক্রমের প্রশংসা করে তিনি উল্লেখ করেন, এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানবাধিকার কমিশন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য কোনো আইন থেকে উন্নত বলে তিনি দাবি করেন।
আইন‑প্রণয়নের পাশাপাশি সিভিল রিট্রিবিউশন প্রসেস কোড (সিআরপিসি) ও সিভিল প্রসিডিউর কোড (সিপিসি)‑এ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে, আইনগত সহায়তা (লিগ্যাল এইড) কার্যক্রমের পরিধি দশগুণ বৃদ্ধি পেয়ে এখন মানুষ বিনা খরচে আইনি সহায়তা পেতে পারে। এই সাফল্যের স্বীকৃতিতে ব্র্যাক সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা অনুদান প্রদান করেছে এবং লক্ষ্য রাখা হয়েছে এই সেবা বিশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ড. আসিফ উল্লেখ করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশের আর্থিক নীতি পুনর্গঠন করা হয়েছে, যার ফলে রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভগ্নপ্রায় ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, এবং বিরোধী দল ও ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ২০,০০০‑এরও বেশি হয়রানিমূলক মামলাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি এ সবকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন, যদিও সমালোচনার সময় এসব বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।
ড. আসিফের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তিনি শেয়ার করেন। গত ১৬ মাসে তিনি সর্বাধিক সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন, যেখানে তাকে পাকিস্তানের দালাল এবং পরে ভারতের দালাল বলে অপপ্রচার করা হয়েছে। এছাড়া, তার যুক্তরাষ্ট্রে সম্পত্তি ও পরিবারের সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি এ সবকে চ্যালেঞ্জেরূপে গ্রহণ করে, তার কাজের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
সংলাপের শেষে উপস্থিত অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা ড. আসিফের মন্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে সরকারী সংস্কারকে সমর্থন করার পাশাপাশি অবশিষ্ট কাজের জন্য গঠনমূলক সমালোচনা করার আহ্বান জানান। ভবিষ্যতে নীতি‑নির্ধারণে এই ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই নীতি‑সংলাপের মাধ্যমে সরকারী সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়ন ও সমালোচনার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার মঞ্চ তৈরি হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করবে।



