নির্বাচনকালীন তথ্যের গণ্ডগোলের পেছনে ডিপফেক, চিপফেকসহ দশটি কৌশল সক্রিয় রয়েছে বলে ফ্যাক্টচেকার, বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রিউমর স্ক্যানার অনুযায়ী, এই কৌশলগুলোর মাধ্যমে মোট ১,৪৩৯টি ভিন্ন ভিন্ন ধরণের ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সরাসরি মিথ্যা ১,০৫১টি, বিকৃত তথ্য ২৫৩টি, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ১৩২টি, আংশিক মিথ্যা ৩টি এবং আংশিক সত্য ২টি অন্তর্ভুক্ত। এই সংখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে যাচাইহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সরাসরি মিথ্যা এখনো অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ার।
অপতথ্য ছড়ানো অ্যাকাউন্ট ও পেজ শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও, সেসব কন্টেন্টের পিছনে কে রয়েছে তা নির্ণয় করতে গভীর তদন্তের প্রয়োজন। ফ্যাক্টচেকার সংস্থাগুলো এই ধরণের তদন্তে সীমাবদ্ধ, তাই তারা কেবলই তথ্যের উৎস চিহ্নিত করতে পারে না। ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরীর মতে, এই ঘাটতি অপতথ্যের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিকভাবে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। তদুপরি, আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী, যাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গ্রুপ গঠন করে গুজব ছড়াচ্ছেন। এ ধরনের গ্রুপ ও পেজের সংখ্যা শতাধিক, যা ইতিমধ্যে সনাক্ত করা হয়েছে।
সরকারের ক্ষেত্রেও অপতথ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মাঠ প্রশাসনের প্রতিনিধিদের একটি বৈঠকে সামাজিক মিডিয়া ও প্রযুক্তির অপব্যবহার, গুজব মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। এই আলোচনার পর, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ) আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করে গুজবের বিস্তার রোধে কাজ শুরু করেছে।
এনসিএসএ এই সেলকে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে বলেছে। পাশাপাশি, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এর সাইবার পুলিশ সেন্টারও গুজবের বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। সিআইডি-র সাইবার পুলিশ সেন্টারের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এম এ বাশার তালুকদার উল্লেখ করেন, নির্বাচনের আগে থেকে তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করতে এই পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে।
এইসব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হল ভোটারদের সঠিক তথ্য সরবরাহ করা এবং মিথ্যা কন্টেন্টের প্রভাব কমিয়ে নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত করা। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ডিপফেক ও চিপফেকের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি কন্টেন্টের শনাক্তকরণ এখনো চ্যালেঞ্জিং। তাই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রযুক্তিগত ও মানবিক উভয় দিক থেকে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হবে। এই দিকগুলোতে সরকার, সিভিল সোসাইটি ও মিডিয়া সংস্থার সমন্বিত কাজই দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে রক্ষা করবে।



