শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বহু মানুষ হাঁটু, কোমর, ঘাড়, কাঁধ এবং হাত‑পায়ের ছোট জয়েন্টে ব্যথা ও কঠোরতা অনুভব করছেন। বিশেষ করে অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা অন্যান্য রিউমাটিক রোগে আক্রান্ত রোগী, পূর্বে জয়েন্টে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠী শীতের ঠাণ্ডা বাতাসে লক্ষণগুলো তীব্রতর হতে দেখেন। এই পরিবর্তনের মূল কারণ পরিবেশগত শীতলতা এবং শীতকালে পরিবর্তিত জীবনধারা।
শীতের নিম্ন তাপমাত্রা রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে, ফলে জয়েন্ট ও পার্শ্ববর্তী পেশীর রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। রক্তের প্রবাহ হ্রাস পেলে পেশি ও টিস্যুতে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ কমে, যা ব্যথা ও কঠোরতার অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়।
তাছাড়া, শীতের প্রভাব সাইনোভিয়াল তরলের গঠনে দেখা যায়; ঠাণ্ডা বাতাসে এই তরল ঘন হয়ে যায় এবং জয়েন্টের মসৃণ গতি বজায় রাখতে তার কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে জয়েন্টের ঘর্ষণ বৃদ্ধি পায় এবং অস্বস্তি তীব্র হয়।
শীতকালে মানুষ প্রায়শই ঘরের ভেতরে কম শারীরিক ক্রিয়াকলাপ করে, যা পেশীর শক্তি হ্রাস এবং জয়েন্টের নড়াচড়া সীমিত করে। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ও বায়ুচাপের পরিবর্তন সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যথা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এই ধরনের শীতকালীন জয়েন্টের অস্বস্তি মোকাবিলায় প্রথমে শরীর ও প্রভাবিত জয়েন্টকে উষ্ণ রাখা জরুরি। গরম কাপড়, থার্মাল গার্মেন্টস, হাঁটু বা কোমরের সাপোর্টার ব্যবহার এবং ঠাণ্ডা বাতাসের সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা ব্যথা কমাতে সহায়ক।
উষ্ণতা প্রদানকারী থেরাপি, যেমন গরম পানির স্নান, হিট প্যাড বা হিটিং প্যাডের ব্যবহার রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে জয়েন্টের কঠোরতা হ্রাস করে। নিয়মিত গরম সেঁক দিলে পেশি শিথিল হয় এবং ব্যথা কমে।
ফিজিক্যাল থেরাপি শীতকালে জয়েন্টের ব্যথা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি। আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, শর্টওয়েভ ডায়াথার্মি, ইন্টারফেরেন্সিয়াল থেরাপি (IFT), টেনস (TENS) এবং জয়েন্ট-নির্দিষ্ট থেরাপিউটিক এক্সারসাইজের মাধ্যমে ব্যথা কমে, নড়াচড়া উন্নত হয় এবং জয়েন্টের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার হয়।
নিয়মিত স্ট্রেচিং এবং হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম পেশিকে জয়েন্টের চারপাশে সমর্থন দেয়, ফলে দুর্বলতা কমে এবং ভবিষ্যতে আরও ক্ষতি রোধ হয়। বিশেষ করে পা, পিঠ এবং হাতে সহজ স্ট্রেচিং রুটিন শীতের মাসগুলোতে বজায় রাখা উচিত।
ব্যথা উপশমকারী ও প্রদাহনাশক ওষুধের ব্যবহার শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শে করা উচিত। স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেইনকিলার বা নন‑স্টেরয়েডাল অ্যান্টি‑ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (NSAIDs) গ্রহণ করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
শীতের সময় জয়েন্টের স্বাস্থ্য রক্ষায় সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং ভিটামিন‑ডি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের গুরুত্বও অবহেলিত করা যায় না। তাজা শাকসবজি, বাদাম, মাছ এবং দইয়ের মতো পুষ্টিকর খাবার ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে এবং জয়েন্টের অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করে।
বহিরঙ্গন কার্যকলাপের পরিবর্তে ঘরে সহজ যোগব্যায়াম, পিলাটেস বা হালকা স্ট্রেচিং রুটিন গড়ে তোলা শীতকালে সক্রিয় থাকার একটি নিরাপদ উপায়। তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেলে গরম পানীয় গ্রহণ এবং অতিরিক্ত স্তরের পোশাক পরা শীতের শক কমাতে কার্যকর।
যদি শীতের কারণে জয়েন্টে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো সঠিক থেরাপি ও ওষুধের সমন্বয় দীর্ঘমেয়াদী জয়েন্টের ক্ষতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সারসংক্ষেপে, শীতের ঠাণ্ডা বাতাসে জয়েন্টের ব্যথা ও কঠোরতা নিয়ন্ত্রণের জন্য উষ্ণতা বজায় রাখা, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, পেশাদার ফিজিক্যাল থেরাপি এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ওষুধের ব্যবহার একসাথে করা প্রয়োজন। আপনার শীতকালীন জয়েন্টের স্বাস্থ্যের জন্য কোন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা নিয়ে আপনার মতামত শেয়ার করুন বা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করুন।



