যশোরের মুড়লীতে, শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে, এক সাদা ইমামবাড়া দাঁড়িয়ে আছে, যার বয়স প্রায় ২২৩ বছর। এই ভবনটি মূলত মহররমের অনুষ্ঠান ও শিয়া মুসলমানদের সমাবেশের জন্য নির্মিত, এবং স্থানীয় মানুষদের কাছে হাজি মুহম্মদ মুহসীনের ইমামবাড়া নামে পরিচিত। ১৮০২ সালে মন্নুজান খানম, হাজি মুহম্মদ মুহসীনের সৎবোন, এই কাঠামোটি নির্মাণ করেন, যা মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
ইমামবাড়ার আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ১৮.২৯ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫.২৪ মিটার, যা একটি আয়তাকার সভা কক্ষের রূপ ধারণ করে। অভ্যন্তরে দশটি স্তম্ভ তিনটি সমান্তরাল সারিতে সাজানো, যা কক্ষকে তিন ভাগে ভাগ করে। স্তম্ভের খিলানগুলো সূক্ষ্ম খাঁজকাটা ও নকশা যুক্ত, এবং সাধারণ পলেস্টারের ওপর ফুলের নকশা অঙ্কিত। ছাদটি সমতল, এবং ছাদের সিলিংয়ে ফুলের স্টাকো নকশা দেখা যায়। ভবনের সামনের দিকে চার ধাপের সিঁড়ি রয়েছে, যা দর্শকদের প্রবেশের পথ নির্দেশ করে।
এই ইমামবাড়া শিয়া মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাদপীঠ হিসেবে কাজ করে এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে রক্ষা করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১৯ মার্চ সরকার এই কাঠামোকে প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে, যা এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যকে স্বীকৃতি দেয়।
ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের ১৯১৪ সালে প্রকাশিত “যশোহর-খুলনার ইতিহাস” বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে, “শিল্প ও স্থাপত্য” অধ্যায়ে এই ইমামবাড়ার উল্লেখ রয়েছে। মিত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইমামবাড়া মুহম্মদ মুহসীনের মোতোয়ালিদিগের (ওয়াকফ ব্যবস্থাপক) সময়ে নির্মিত হয় এবং সমতল ছাদসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বহন করে। ঐ সময়ের অন্যান্য নথি ও পত্রিকায়ও এই ভবনের নির্মাণ ও ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
হাজি মুহম্মদ মুহসীন ১ আগস্ট ১৭৩২ সালে জন্মগ্রহণ করেন, তার পিতা ছিলেন হাজি ফয়জুল্লাহ। পরিবারটি মূলত ইরান বা পারস্য থেকে আসা, তবে পূর্বপুরুষদের আরব ভূমিতে বসবাসের ঐতিহ্য রয়েছে। মুহসীনের পূর্বপুরুষদের মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময় দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যেখানে আগা মোতাহার নামের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।
আওরঙ্গজেবের অনুমোদনে আগা মোতাহারকে যশোর, হুগলি, নদীয়া ও ২৪ পারগনা জেলায় বিশাল জমি প্রদান করা হয়। পরে তিনি হুগলিতে বসতি স্থাপন করেন, যেখানে তার স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা মন্নুজান ছিলেন। কিছু সময় পর আগা মোতাহার মারা যান, এবং তার বিধবা স্ত্রী মন্নুজানই পরে মুড়লীর ইমামবাড়া নির্মাণের দায়িত্ব নেন।
এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, বরং শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র-ছাত্রীরা যখন স্থানীয় ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর উপর গবেষণা করে, তখন এই ধরনের সংরক্ষিত ভবন সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের সুযোগ পায়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এই ধরণের স্থানীয় ঐতিহ্যকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ইমামবাড়ার সংরক্ষণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে ভবনের মূল নকশা ও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সমন্বয়ে সময়ে সময়ে মেরামত ও পরিষ্কারের কাজ করা হয়। ভবনের চারপাশে পর্যটক ও গবেষকদের জন্য তথ্যপত্র ও নির্দেশিকা স্থাপন করা হয়েছে, যা দর্শনার্থীদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝতে সহায়তা করে।
প্রাচীন স্থাপত্যের সংরক্ষণে সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়ই ইমামবাড়ার রক্ষণাবেক্ষণে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নেন এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর সময় এর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখেন। এই ধরনের সমন্বিত প্রচেষ্টা ভবনের দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণে সহায়তা করে।
শিক্ষা সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ইমামবাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বাস্তবিক শিক্ষার ক্ষেত্র। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যশৈলীর সংযোগ স্থাপন করে, তারা তত্ত্বগত জ্ঞানকে বাস্তবিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গভীর করতে পারে। শিক্ষকদের জন্যও এটি একটি মূল্যবান সম্পদ, যেখানে ফিল্ড ট্রিপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গবেষণা দক্ষতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা গড়ে তোলা যায়।
অবশেষে, ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। স্থানীয় বিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে ইমামবাড়ার মতো স্থানীয় ঐতিহ্যকে শিক্ষার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে উৎসাহিত করা উচিত। শিক্ষার্থীদেরকে প্রশ্ন করতে বলা যায়, “এই ভবনের নকশা ও নির্মাণে কোন ঐতিহাসিক প্রভাব রয়েছে?” অথবা “কীভাবে আমরা ভবিষ্যতে এই ধরনের নিদর্শন রক্ষা করতে পারি?” এসব প্রশ্ন তাদের গবেষণা ও বিশ্লেষণের দক্ষতা বাড়াবে।
ইমামবাড়া আজও তার ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা বজায় রেখেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শিক্ষামূলক সম্পদ হিসেবে কাজ করবে। সংরক্ষণে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং শিক্ষামূলক ব্যবহার একসাথে মিলিয়ে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা দীর্ঘদিন টিকে থাকবে।



