ঢাকার সিআইআরডিএপি অডিটোরিয়ামে গতকাল অনুষ্ঠিত নীতি সংলাপে রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেন্টার ফর গভার্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজন করা এই সভায় সিভিল সোসাইটি, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিতদের মতে, জুলাই মাসের পর থেকে রাজনৈতিক পরিবেশে গোষ্ঠীমূলক হিংসা, সরকারী অকার্যকরতা এবং স্ব-সেন্সরশিপের বৃদ্ধি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।
ইলেকশন আসন্ন হওয়ায় মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে, এমন মন্তব্যে অংশগ্রহণকারীরা জোর দেন যে অস্পষ্টভাবে গঠিত আইনগুলো এখনও রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নাগরিক স্থানের সংকোচন ঘটিয়ে তুলেছে, যেখানে হুমকি, হিংসা, হয়রানি এবং স্ব-সেন্সরশিপের মাধ্যমে নাগরিক সমাজের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হচ্ছে।
সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্রোহের বর্ণনা রাজনৈতিক স্বার্থে পণ্যসামগ্রীতে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা পূর্বের ১৫ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা ব্যবহার করার পদ্ধতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি বলেন, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো স্বতন্ত্র বিষয় নয়; নির্বাচনের নিকটবর্তী সময়ে এই ক্ষেত্রগুলো স্বাভাবিকভাবে সংকুচিত হয়।
আইনি সংস্কার নিয়ে আলোচনা চললেও, জিল্লুর মতে শুধুমাত্র আইন পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি আইনগুলো এখনও অস্পষ্ট থাকে এবং তদারকি দুর্বল থাকে, তবে সেগুলো সহজেই রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, যা সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়াবে। এছাড়া, ক্ষমতার কাঠামোতে পরিবর্তন না ঘটলে, রাজনৈতিক নেতা হোক বা সিভিল সোসাইটি সদস্য, ক্ষমতার আসনে বসে একই রকম আচরণ বজায় রাখে।
মুক্ত মতপ্রকাশের হুমকি এখন কেবল সরকারী নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়; ব্যক্তিগত গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা সরাসরি মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হিংসা চালিয়ে যাচ্ছে। জিল্লুর উল্লেখে, সম্প্রতি প্রথাম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার অফিসে অগ্নিকাণ্ডের সময় সরকারী অকার্যকরতা বিশেষভাবে সমালোচিত হয়েছে। তিনি এই আক্রমণগুলোকে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে, সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
অংশগ্রহণকারীরা সম্মত হন যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কেবল আইনগত কাঠামো নয়, তদারকি ও বাস্তবায়নের দৃঢ়তা প্রয়োজন। তারা ভবিষ্যতে নির্বাচনের সময় এই বিষয়গুলো আরও তীব্রভাবে আলোচিত হবে বলে পূর্বাভাস দেন, এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে আহ্বান জানান।
সংলাপের সমাপনীতে, উপস্থিত সকল পক্ষ একমত হন যে, স্ব-সেন্সরশিপ ও গোষ্ঠীমূলক হিংসা কমাতে সমাজের সকল স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা অপরিহার্য। এ ধরনের পদক্ষেপগুলোই নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা জোর দেন।
এই আলোচনার পর, সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠীগুলো আইন সংস্কার ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যাতে আসন্ন নির্বাচনের সময় নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়।



