বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে গভীর সংকট বিনিয়োগের স্থবিরতা, যা নতুন সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে। বেসরকারি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগ সাম্প্রতিক সময়ে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে, ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে।
উচ্চ সুদের হার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে তুলেছে, ফলে দেশীয় ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে, উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়নের গতি গত দশকের মধ্যে সবচেয়ে ধীর হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) উল্লেখ করেছে যে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে না রাখলে বর্তমান সংকট আরও গভীর হবে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, বিনিয়োগের হ্রাসই বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা, যা সরাসরি বেকারত্ব বাড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
সিপিডির “বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬ : নির্বাচনি বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি” শীর্ষক স্বতন্ত্র পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ১১.৫ শতাংশ, যা গত দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই ধীরগতি সরকারী ব্যয়ের অভাবকে বাড়িয়ে তুলছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করছে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, উন্নয়ন প্রকল্পের বড় অংশ অবকাঠামোতে কেন্দ্রীভূত হলেও মানবসম্পদ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাস্তবায়ন ধারাবাহিকভাবে দুর্বল। এই ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলে।
বিনিয়োগের স্থবিরতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ব্যাংক খাতের সংকট চিহ্নিত করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং তদারকির দুর্বলতা ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিনিয়োগ সহায়তা প্রদানকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে, প্রকল্প অর্থায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সাপোর্ট যথাযথভাবে পৌঁছাতে পারছে না।
সিপিডির প্রতিবেদনে উপস্থিত ছিলেন সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, যারা বিশ্লেষণে জোর দিয়েছেন যে, নীতি ধারাবাহিকতা ও সুশাসন ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার কঠিন। ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ হবে বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস জয় করা, যার জন্য স্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং স্বচ্ছ নীতি প্রয়োজন।
গ্লোবাল বাজারে চাল ও গমের দাম হ্রাস পেয়েও দেশীয় বাজারে তা প্রতিফলিত হয়নি। এই পরিস্থিতি বাজার কাঠামোর দুর্বলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবকে উন্মোচিত করে। ফলস্বরূপ, কৃষি পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল থাকে না এবং উৎপাদনকারীদের আয় কমে যায়।
সিপিডি উল্লেখ করেছে যে, অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় বাড়লেও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের ঘাটতি উৎপাদনশীলতা হ্রাসের মূল কারণ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত তহবিল না পৌঁছানোর ফলে কর্মশক্তির দক্ষতা কমে যায়, যা বিনিয়োগের আকর্ষণীয়তা হ্রাস করে।
ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধান না হলে, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হবে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ঋণদানের ক্ষমতা হ্রাস পায়, যা সরাসরি বিনিয়োগ প্রকল্পের বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।
সামগ্রিকভাবে, বিনিয়োগের স্থবিরতা, ধীরগতি উন্নয়ন ব্যয়, এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা একত্রে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। নতুন সরকার যদি নীতি ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার বজায় রাখতে পারে, তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে।
তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের পুনরুৎপাদন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ত্বরিত পদক্ষেপের প্রয়োজন, নতুবা অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।



