ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তেহরানে চলমান সরকারবিরোধী প্রতিবাদকে মোকাবিলার জন্য দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় নিয়ে গেছেন। এই পদক্ষেপের মধ্যে ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ সক্রিয় করা, ইরানীয় রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)‑এর ওপর বেশি নির্ভরশীলতা এবং সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা পুনর্বিন্যাস অন্তর্ভুক্ত।
বিকাশের পটভূমিতে, খামেনি পূর্বের ২০২৫ সালের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’‑এর চেয়েও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বি‑৫২ বোমারু বিমান আকাশে উড়লেও তেহরান ত্যাগ করবেন না, এমন দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে, তিনি আইআরজিসি‑এর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারকে অটুট বলে উল্লেখ করে, সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর তুলনায় তাদের ওপর বেশি আস্থা রাখছেন।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী নাগরিকদের ওপর ব্যাপক গ্রেফতার চালু হয়েছে। সরকারগত সূত্র অনুযায়ী, একদিনের মধ্যে দেশজুড়ে মোট ২,২৭৭ জনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৬ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ৪৮ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। এই সংখ্যা পূর্বের প্রতিবাদে গ্রেফতারকৃতদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার তীব্রতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
বিক্ষোভের সময় গুলিবর্ষণও ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তেহরানে একদিনে অন্তত ২১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার বেশিরভাগই সরাসরি গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা সুবিধা ও জরুরি সেবা প্রদানেও চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তিনি ইরানি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো অব্যাহত থাকে, তবে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। ট্রাম্পের মতে, ইরান বর্তমানে বড় বিপদের মুখে এবং পরিস্থিতি এমন দিকে এগোচ্ছে যা কয়েক সপ্তাহ আগে কল্পনাও করা যায়নি।
ইরানের সামরিক কৌশলগত পদক্ষেপের অংশ হিসেবে, একই রাতে রাশিয়া ও চীনের নৌবাহিনীর সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানি যুদ্ধজাহাজগুলো এই আন্তর্জাতিক মহড়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তি প্রদর্শন করেছে।
এই নিরাপত্তা সতর্কতা ও সামরিক সমন্বয় ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। আইআরজিসি‑এর ওপর বাড়তি নির্ভরতা এবং বৃহৎ পরিসরের গ্রেফতার ব্যবস্থা সরকারকে প্রতিবাদ দমন করার ক্ষমতা বাড়াবে, তবে একই সঙ্গে জনমত ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখোমুখি হতে পারে।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী তরুণ ও শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার, পাশাপাশি গুলিবর্ষণ থেকে সৃষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা, মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের নিরাপত্তা নীতি ও মানবাধিকার রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন।
আইআরজিসি‑এর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার দাবি সত্ত্বেও, অতীতের অন্যান্য বাহিনীর ভাঙনের উদাহরণগুলো এই বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তবে খামেনি এই ঝুঁকি কমিয়ে, দেশের নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে চান।
বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রভাবের দিক থেকে, ইরানের রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা তার কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর মন্তব্য ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলবে।
অবশিষ্ট সময়ে, ইরানের নিরাপত্তা সংস্থা এবং আইআরজিসি কীভাবে এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালিয়ে যাবে, এবং প্রতিবাদকারীরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি হয়ে থাকবে।



