ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে থাকা হলের নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আজ একটি প্রতিবাদসূচক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। নেটওয়ার্কের মতে, নামকরণের এই ধারা কোনো সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য চালু করা একটি এজেন্ডা। তারা যুক্তি দিয়েছে যে, জুলাই ২০২৩-এ ঘটিত অভ্যুত্থানকে কাজে লাগিয়ে এই ধরনের পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্র ও জনগণের আর্থিক সম্পদ ব্যবহার করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় নামকরণ করা উচিত নয়, বরং নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালানোও বন্ধ করা দরকার। শিক্ষক নেটওয়ার্কের দৃষ্টিতে, নামকরণের এই সংস্কৃতি বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে আরও অনধিকৃত পরিবর্তন ঘটতে পারে।
১৯৯০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি নতুন ছাত্রাবাস নির্মিত হলে সেগুলোকে জাতীয় নেতারা শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়। এই দুই ছাত্রাবাস পার্শ্ববর্তী অবস্থানে অবস্থিত এবং তখন থেকে তাদের নাম পরিবর্তনের কোনো আলোচনা হয়নি। তবে সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু হলের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে নেটওয়ার্ক হঠকারী এবং রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ক বলে সমালোচনা করেছে।
নেটওয়ার্কের মতে, ২৪ই জানুয়ারি ২০২৪-এ ঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবেশে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে, তবে সব পরিবর্তনই ন্যায়সঙ্গত নয়। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, জাতীয় নেতাদের নামে থাকা ছাত্রাবাসের সহাবস্থানিক সৌন্দর্য কখনোই দেশের রাজনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। তাই, নাম পরিবর্তনের পেছনে স্বৈরাচারী নেতৃত্বের পতনকে যুক্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের একটি সদস্য উল্লেখ করেছেন, “শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি ছাত্রাবাস থাকা কেবল ন্যায়সঙ্গত নয়, বরং প্রয়োজনীয়ও।” তিনি যুক্তি দেন যে, দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় নেতাদের নাম সংরক্ষণ করা ঐতিহাসিক স্মৃতি রক্ষার একটি অংশ।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, শহীদ হাদির নামে নতুন কোনো ভবনের নামকরণ প্রস্তাব করা হয়েছে। নেটওয়ার্কের মতে, তিন-চার দশক ধরে একই নামে পরিচিত ছাত্রাবাসের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগকে তারা রাজনৈতিক ক্ষুদ্রতা হিসেবে দেখছে। তারা এই পরিবর্তনকে ‘হীন রাজনৈতিক ক্ষুদ্রতা’ বলে সমালোচনা করেছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা দাবি করেছেন যে, নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা এবং জনমত বিবেচনা ছাড়া চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
এই বিরোধের পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর ইচ্ছা স্পষ্ট। নেটওয়ার্কের মতে, নামকরণ ও নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়, তবে তা শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের এই পদক্ষেপটি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনার সূত্রপাত করেছে। কিছু শিক্ষার্থী এই পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে, অন্যদিকে কিছু শিক্ষার্থী নেটওয়ার্কের অবস্থানকে সমর্থন করেছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে নামকরণের ঐতিহ্য ও তার সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যায়, নামকরণ প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ এবং ঐতিহাসিক ভিত্তিতে হয়, তবে তা শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। তবে রাজনৈতিক স্বার্থে নাম পরিবর্তন করা হলে তা শিক্ষার স্বাতন্ত্র্যকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত শহীদ হাদির নামকরণ প্রস্তাবটি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নতুন স্মারক স্থাপনের একটি উদাহরণ। যদি এই প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের শেষ বক্তব্যে তারা পাঠকদেরকে প্রশ্ন তুলেছে: “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সীমা কোথায় হওয়া উচিত?” এই প্রশ্নটি শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষা সংক্রান্ত এই বিতর্কে পাঠকদের জন্য একটি ব্যবহারিক টিপস: যদি আপনার ক্যাম্পাসে নাম পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাব আসে, তবে তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করুন, সংশ্লিষ্ট নীতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝে সিদ্ধান্ত নিন। আপনার মতামত প্রকাশের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটিতে অংশগ্রহণ করুন, যাতে স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়।



