লকহিড মার্টিন ২০২৫ সালে এফ‑৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান উৎপাদনে নতুন শীর্ষে পৌঁছেছে। ওই বছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ১৯১টি এফ‑৩৫ সরবরাহ করেছে, যা পূর্বের সর্বোচ্চ ১৪২টি রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে। গড়ে দুই দিনে একটি করে এফ‑৩৫ উৎপাদন করা হয়েছে, ফলে বার্ষিক উৎপাদন হার বিশ্বব্যাপী আধুনিক যোদ্ধা বিমানের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
এই উচ্চ উৎপাদন গতি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কৌশলগত ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লকহিড মার্টিনের তথ্য অনুযায়ী, এফ‑৩৫-এর বার্ষিক উৎপাদন হার কোনো মিত্র দেশের আধুনিক যুদ্ধবিমানের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি, যা সামরিক শিল্পে আমেরিকান অগ্রগতির স্পষ্ট সূচক।
ইউরোপ ও রাশিয়ার প্রধান যুদ্ধবিমান নির্মাতারা একই বছরে তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যা উৎপাদন করেছে। ফ্রান্সের দাসো অ্যাভিয়েশন ২০২৫ সালে মাত্র ২৬টি রাফাল সরবরাহ করেছে, যার মধ্যে ১৫টি রপ্তানি এবং ১১টি ফরাসি সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহারিক।
রাশিয়ার ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন (উয়াক) একই সময়ে সু‑৩৫ যুদ্ধবিমান উৎপাদন করেছে, তবে মোট সংখ্যা ১৪ থেকে ২১টির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয় যে রাশিয়া এফ‑৩৫ উৎপাদনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
ইউরোফাইটার টাইফুন এবং সুইডিশ গ্রিপেনের উৎপাদনও সীমিত ছিল। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে প্রায় ১২টি টাইফুন এবং ১৭টি গ্রিপেন সরবরাহ করা হয়েছে। এই সংখ্যা এফ‑৩৫-এর মোট উৎপাদনের তুলনায় অল্পই।
লকহিড মার্টিনের এফ‑৩৫ উৎপাদন ১৯১টি, যা রাফাল, টাইফুন, সু‑৩৫, সু‑৩৪ এবং গ্রিপেনের সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও বেশি। ফলে একক কোম্পানি এক বছরে পাঁচটি প্রধান ইউরোপীয় ও রাশিয়ান যুদ্ধবিমানের মোট উৎপাদনকে অতিক্রম করেছে।
এফ‑৩৫ প্রোগ্রামের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল ম্যানেজার চ্যান্সি ম্যাকইন্টশ ২০২৫ সালের উৎপাদন লক্ষ্য পূরণে গর্ব প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, এফ‑৩৫ বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং ভবিষ্যতেও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।
বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১৩,০০০টির কাছাকাছি এফ‑৩৫ সক্রিয় রয়েছে এবং এই বিমানটি ১২টি দেশের সেবা গ্রহণ করছে। এফ‑৩৫-এর সংখ্যা পঞ্চম প্রজন্মের অন্যান্য যুদ্ধবিমান—যেমন এফ‑২২, রুশ সু‑৫৭, চীনের জে‑২০ ও জে‑৩৫—এর চেয়ে বেশি, যা এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা নির্দেশ করে।
উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও এফ‑৩৫-এর চাহিদা কমেনি। ২০২৫ সালের শেষের দিকে লকহিড মার্টিনের অর্ডার ব্যাকলগ প্রায় ৪১৬টি বিমানে পৌঁছেছে। ইতালি ও ডেনমার্ক তাদের পরিকল্পিত এফ‑৩৫ বহর বাড়িয়েছে, আর মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ও তুরস্কের পাশাপাশি ইসরায়েলও নতুন ক্রয়ের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
ভারতও এফ‑৩৫ ক্রয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় রয়েছে, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নির্ধারিত হয়নি। এই ক্রয় সম্ভাবনা এফ‑৩৫কে বিশ্ববাজারে আরও বিস্তৃত করে তুলবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, লকহিড মার্টিনের উৎপাদন রেকর্ড শুধু সংখ্যাত্মক সাফল্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এফ‑৩৫-এর উচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা মিত্র দেশগুলোর আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত করে এবং প্রতিপক্ষের উপর প্রযুক্তিগত প্রাধান্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। ভবিষ্যতে এফ‑৩৫ আরও বেশি দেশকে সেবা প্রদান করবে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন গতিবিধি তৈরি করতে পারে।



