ঢাকা, ১০ জানুয়ারি—সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও সহিংসতা রোধের জন্য জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন শীর্ষে উঠে বললেন, ভোটের সময় অর্থের ছড়াছড়ি না হওয়া এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা দেশের টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
এই বক্তব্যটি শনিবার ধানমন্ডিতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকি’ শীর্ষক এক সেমিনারে উপস্থাপিত হয়। সেমিনারটি অর্থনৈতিক নীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশ্লেষণমূলক আলোচনা হিসেবে পরিচালিত হয়। উপস্থিত বিশিষ্ট গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা সিপিডির গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশ শোনার সুযোগ পান।
ড. ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেন, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর, এবং প্রার্থীদের উচিত স্বচ্ছ আর্থিক নীতি মেনে চলা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনে অর্থের অনিয়ম রোধে প্রার্থীদের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন, যাতে ভোটাররা কোনো আর্থিক প্রভাবের ছায়া ছাড়াই তাদের পছন্দ প্রকাশ করতে পারে।
সহিংসতা মুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার গুরুত্বও তিনি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভোটারদের নিরাপদে ভোটদান নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে কোনো হিংসাত্মক সংঘর্ষ না হওয়া জরুরি। শান্তিপূর্ণ ভোটদান প্রক্রিয়া না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ব্যাংক খাতের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। ঋণখেলাপি কমাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন ও রেজুলেশন আইনের পূর্ণ বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এসব সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন বলে তিনি সতর্ক করেন।
মহামারী পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ে ড. ফাহমিদা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট মূল্যস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে স্থির রয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এই পরিস্থিতিকে কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত করেছে, যা শুধুমাত্র সুদের হার বাড়িয়ে সমাধান করা যায় না। বাজার তদারকি ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের প্রয়োজন তিনি উল্লেখ করেন।
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতিশীলতা সত্ত্বেও সিপিডি লো-ডেভেলপড কান্ট্রি (এলডিসি) উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং যুবশক্তির সঠিক ব্যবহারকে অর্থনৈতিক গতি বাড়ানোর মূল উপায় হিসেবে তিনি তুলে ধরেন। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলে তিনি জোর দেন।
অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ঋণভারের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং বাজেটের বড় অংশ এখন সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ পড়তে পারে, যা অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য হুমকি স্বরূপ।
অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং অন্যান্য গবেষকও উপস্থিত ছিলেন। তারা বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে নীতি নির্ধারকদের সামনে প্রাসঙ্গিক সুপারিশ তুলে ধরেন।
সিপিডির এই আহ্বান নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। সংগঠনটি বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক গতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, যা শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের মঙ্গলে পরিণত হবে।



