চীন, রাশিয়া ও ইরান এই সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন উপকূলে একত্রে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও জলদস্যু বিরোধী প্রশিক্ষণ চালু করেছে। মহড়া চীনের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং সপ্তাহব্যাপী চলবে, যার শেষ তারিখ আগামী শুক্রবার নির্ধারিত। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো তাদের যুদ্ধজাহাজ ও সহায়ক জাহাজ পাঠিয়ে সমুদ্র নিরাপত্তা, সমন্বিত অপারেশন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্য নিয়েছে।
এই প্রশিক্ষণটি ব্রিকস (BRICS) জোটের অধীনে আয়োজিত, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিনের সদস্য। ইরান ২০২৪ সালে এই জোটে যোগদান করে এবং এই মহড়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার সামরিক উপস্থিতি দৃঢ় করেছে। পূর্বে পরিকল্পিত ছিল যে মহড়া গত বছরের নভেম্বরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতো, তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় একই সময়ে জি-টুইন্টি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজনের কারণে সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়।
কেপটাউনের দক্ষিণে অবস্থিত সাইমন্স টাউনে, যা ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিকের সংযোগস্থল, প্রধান নৌঘাঁটে চীন, রাশিয়া ও ইরানের যুদ্ধজাহাজগুলো প্রবেশ করেছে। চীনের পক্ষ থেকে ১৬১ মিটার দৈর্ঘ্যের ডেস্ট্রয়ার শ্রেণীর তাংশান যুদ্ধজাহাজ উপস্থিত, যা আধুনিক রাডার ও মিসাইল সিস্টেমে সজ্জিত। রাশিয়া তুলনামূলকভাবে ছোট স্তোইকি যুদ্ধজাহাজ এবং একটি রসদ সরবরাহকারী ট্যাংকার পাঠিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী অপারেশনের জন্য লজিস্টিক সমর্থন দেবে।
ইরানের অংশগ্রহণের পটভূমিতে দেশীয় রাজনৈতিক অশান্তি রয়েছে; ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বের বিরোধে ব্যাপক প্রতিবাদ চলছে। তবুও, ইরান সরকার এই মহড়াকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক দৃঢ় করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ইরানের এই পদক্ষেপ তার পারমাণবিক ও আঞ্চলিক নীতি সমর্থনকারী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
ব্রিকসের অন্যান্য সদস্য দেশ, যেমন ব্রাজিল, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, এই মহড়ায় অংশগ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রদান করেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার সশস্ত্র বাহিনীর একটি মুখপাত্র জানিয়েছেন যে মহড়া আগামী শুক্রবার পর্যন্ত চলবে, তবে সব অংশগ্রহণকারী দেশের নাম নিশ্চিত করা হয়নি। এই অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের স্তর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মহড়ার সময় সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং জলদস্যু বিরোধী কৌশল নিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া হবে। অংশগ্রহণকারী জাহাজগুলো সমন্বিত রাডার ট্র্যাকিং, ত্রুটি সনাক্তকরণ এবং সমন্বিত শত্রু মোকাবিলার অনুশীলন করবে। এছাড়া, লজিস্টিক সাপোর্ট, জ্বালানি পুনরায় পূরণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সমন্বয়ও প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
এই সামুদ্রিক মহড়া যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকা, যদিও আফ্রিকায় সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দক্ষিণ আফ্রিকাকে ‘বিশ্বমঞ্চের অশুভ শক্তিগুলোকে সমর্থন’ করার অভিযোগ করেন। এই প্রেক্ষাপটে চীন-রাশিয়া-ইরান নেতৃত্বে মহড়া দক্ষিণ আফ্রিকার বহুমুখী কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই মহড়া ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিকের সংযোগস্থলে কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। কেপটাউন উপকূলীয় অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটের নিকটে অবস্থিত, যা সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো এই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়িয়ে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংঘাত বা নিরাপত্তা হুমকির মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে চায়।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে মহড়ার ফলাফল ও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সমন্বয় পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচনার বিষয় হবে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা এই মহড়াকে চীন-রাশিয়া-ইরান সহযোগিতার সূচক হিসেবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। একই সঙ্গে, ব্রিকস জোটের ভবিষ্যৎ কৌশল ও সম্প্রসারণের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এই প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে।



