ঢাকা শহরের মিরপুর রোডে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি (তিতাস গ্যাস) সম্প্রতি ফাটে যাওয়া ভালভ পরিবর্তন করে নতুন ভালভ বসিয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু করেছে। তবে ভালভের মেরামতের পরও গ্যাসের চাপ স্বল্পচাপ অবস্থায় রয়েছে, যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় নিতে পারে। তিতাস গ্যাসের পক্ষ থেকে শনিবার বিকালে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
নতুন ভালভ স্থাপনের ফলে মিরপুর রোডের পার্শ্ববর্তী গ্যাস নেটওয়ার্কে সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়েছে, তবে চাপের সীমাবদ্ধতা এখনও বজায় রয়েছে। গ্যাসের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে প্রবাহ স্বাভাবিক হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় গ্যাসের ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান ও গৃহস্থালির ওপর সাময়িক প্রভাব পড়বে।
চাপের স্বল্পতা বিশেষ করে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ এবং গাবতলীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। এই এলাকাগুলিতে গ্যাসের প্রবাহ কমে যাওয়ায় রান্নাঘরের গ্যাস চুলা ও হিটিং যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না। ফলে বাসিন্দা ও স্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে, গত দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানীতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকটের চিহ্ন দেখা গিয়েছে। ৪ জানুয়ারি আমিনবাজারে পাইপলাইন ছিদ্রের কারণে গ্যাসের চাপ হ্রাস পায় এবং এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বাসিন্দারা কম চাপে গ্যাস ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এই সমস্যার ফলে এলপিজি চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজারে সরবরাহের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করেছে।
আজ মিরপুর রোডে ঘটিত নতুন দুর্ঘটনায় চার ইঞ্চি ব্যাসের ভালভ ফেটে গ্যাসের লিক সৃষ্টি হয়। লিক মেরামতের জন্য একাধিক ভালভ বন্ধ করা হয়, ফলে বিতরণ লাইনের চাপ আরও কমে যায়। এই কারণে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী ইত্যাদি এলাকায় গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ দেখা যাচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের সূত্র অনুযায়ী, আমিনবাজারে পূর্বে মেরামত করা পাইপলাইনে সম্পূর্ণভাবে পানি বের করা এখনও শেষ হয়নি। পানি সম্পূর্ণ পরিষ্কার না হওয়ায় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হতে অতিরিক্ত কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এই পরিস্থিতি গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গত বৃহস্পতিবার তিতাস গ্যাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল যে, তুরাগ নদীর তলদেশে মালবাহী ট্রলারের নোঙরের আঘাতে গ্যাসের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মেরামত সম্পন্ন হলেও মেরামতকালে পাইপে পানি প্রবেশের ফলে গ্যাসের চাপ হ্রাস পায়। এই ঘটনা গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে।
ঢাকার গৃহস্থালির প্রধান রান্নার জ্বালানি দুটি: তিতাস গ্যাসের মাধ্যমে সরবরাহিত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বেসরকারি বিক্রেতাদের থেকে সিলিন্ডারে বিক্রি হওয়া এলপিজি। উভয় সেক্টরে বর্তমান সংকটের ফলে গৃহস্থালি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, যা বাজারে চাহিদা ও মূল্য উভয়ই প্রভাবিত করছে।
গ্যাসের স্বল্পচাপ ও এলপিজি ঘাটতি সরাসরি রেস্তোরাঁ, হোটেল, ক্যাফে এবং ছোট ব্যবসার কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বাড়ার ফলে এলপিজি বিক্রেতাদের বিক্রয় বৃদ্ধি পেতে পারে, তবে একই সঙ্গে সিলিন্ডার গ্যাসের দামও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতি ভোক্তাদের ব্যয়বহুল জ্বালানির দিকে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে এবং সামগ্রিক গৃহস্থালি ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের জন্য এই ধারাবাহিক সরবরাহ ব্যাঘাত অপারেশনাল খরচ বাড়াচ্ছে এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করছে। গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করতে অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কারের কাজের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে, যা সংস্থার স্বল্পমেয়াদী আর্থিক ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে সেবা মানের উপর বাড়তি নজরদারি প্রত্যাশিত, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গ্যাসের স্বল্পচাপ ও এলপিজি ঘাটতি দুটোই শীঘ্রই মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। গ্যাস সরবরাহের অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়াবে এবং গ্যাস সংস্থাগুলোর অবকাঠামো আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা তীব্র করবে। বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এই সংকট একটি সতর্ক সংকেত, যা গ্যাস নেটওয়ার্কের রিজিলিয়েন্স বাড়াতে এবং সরবরাহ চেইনের ঝুঁকি কমাতে পদক্ষেপের আহ্বান জানায়।
সংক্ষেপে, তিতাস গ্যাসের মিরপুর রোডে ভালভ পরিবর্তনের পর সরবরাহ পুনরায় শুরু হলেও চাপ স্বাভাবিক হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে, এবং পূর্বের পাইপলাইন লিক ও পানি পরিষ্কারের সমস্যার কারণে স্বল্পচাপ অব্যাহত থাকবে। গ্যাসের স্বল্পচাপ ও এলপিজি ঘাটতি উভয়ই শহরের গৃহস্থালি ও ব্যবসায়িক খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, যা মূল্যবৃদ্ধি ও বিকল্প জ্বালানির চাহিদা বাড়াচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো আধুনিকায়ন ও রিজিলিয়েন্স বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট, যা শিল্পের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।



