বাংলাদেশের এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সরবরাহে অব্যাহত ঘাটতি নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছে, যা এখনও সমাধান না হওয়ায় গ্যাস শিল্প ও পরিবহন সেক্টরে বড় ধাক্কা দিচ্ছে। দেশের এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্শন ওয়ার্কশপের মালিকদের সমিতি (বিএলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন) সরকারকে এই সংকটের মূল দায়িত্বে দায়ী করেছে এবং দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হাসিন পারভেজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, গ্যাসের ঘাটতি নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা জনসাধারণের কাছে জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি জানান, এখন ডিসেম্বর শেষ হয়েছে, জানুয়ারির মাঝামাঝি আসন্ন, তবু কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা সমাধান প্রকাশিত হয়নি।
এলপিজি গ্যাস দেশের গৃহস্থালী ও বাণিজ্যিক রান্নার প্রধান জ্বালানি, বিশেষ করে যেখানে গ্যাসের বিকল্প নেই। সরবরাহের অভাবের ফলে গৃহস্থালির রেশনিং বাধ্য হয়ে পড়েছে, আর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও সেবা চালিয়ে যেতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। সমিতি উল্লেখ করে, গ্যাসের ঘাটতি সরাসরি পরিবহন খাতের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে; ট্রাক, বাস ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি গ্যাসে চালিত হলে জ্বালানি ঘাটতি তাদের চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার মূল কারণ হিসেবে সমিতি কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছে। প্রথমত, গ্যাস আমদানি ও বিতরণে জড়িত বড় কোম্পানিগুলোর (বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওমেরা, জি গ্যাস, আই গ্যাস ইত্যাদি) মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। অনুমোদিত প্রায় ১৬-১৮টি কোম্পানির মধ্যে প্রায় ১২টি কোম্পানি বর্তমানে গ্যাস আমদানি করছে, তবে তাদের কার্যক্রমে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা বা সরকারী সমর্থন দেখা যায়নি।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, এনার্জি কমিশন ও গ্যাস অপারেটরদের মধ্যে যৌথ তথ্য শেয়ারিংয়ের অভাব রয়েছে। সমিতি দাবি করে, যদি এই সংস্থাগুলো একত্রে একটি সংবাদ সম্মেলন বা তথ্যবহুল বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করত, তবে জনগণ নিজে থেকেই রেশনিং বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত। তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকায় বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এলপিজি গ্যাসের ঘাটতি সরাসরি ভোক্তা মূল্য সূচকে প্রভাব ফেলবে। গ্যাসের অভাবে রেস্তোরাঁ, হোটেল ও ছোট ব্যবসা তাদের উৎপাদন খরচ বাড়াতে বাধ্য হবে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের কাছে মূল্য বৃদ্ধি হিসেবে পৌঁছাবে। এছাড়া, গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগের আকর্ষণ কমিয়ে দেয়; সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী গ্যাসের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পে ঝুঁকি কমাতে চায়।
পরিবহন খাতে গ্যাস চালিত যানবাহনের ব্যবহার কমে যাওয়ায় লজিস্টিক্স খরচ বাড়বে, যা পণ্যদ্রব্যের উপরও প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে রেল ও সড়ক পরিবহনে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়তে পারে, যা পরিবেশগত দিক থেকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, গ্যাসের সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন ও আমদানি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি। এনার্জি কমিশনকে গ্যাস অপারেটরদের সাথে সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করে, সরবরাহের ঘাটতি কমাতে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, গ্যাসের বিকল্প উৎস (যেমন বায়ো-গ্যাস বা সিএনজি) বিকাশে উৎসাহ প্রদান করে বাজারের বৈচিত্র্য বাড়ানো সম্ভব।
বাজার বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে এলপিজি গ্যাসের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের ক্ষতি এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে। গ্যাসের দাম বাড়ার সম্ভাবনা, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বিকল্প জ্বালানির অনুপস্থিতি ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়াবে। তাই, সংস্থাগুলোকে তৎক্ষণাত্ সমন্বিত তথ্য প্রকাশ এবং রেশনিং পরিকল্পনা তৈরি করে ভোক্তাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংক্ষেপে, নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এলপিজি গ্যাসের সংকট এখনও সমাধান না হওয়ায় দেশের গৃহস্থালী, ব্যবসা ও পরিবহন খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। গ্যাসের সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন, সরকার-শিল্প সমন্বয় এবং বিকল্প জ্বালানি বিকাশের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করা সম্ভব, যা বাজারের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সহায়তা করবে।



