গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টে শুক্রবার রাতের এক যৌথ সভায় পাঁচটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দলের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতের পর স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যানের সঙ্কেত জানিয়েছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে দ্বীপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র অধিকার গ্রিনল্যান্ডের নাগরিকদেরই।
সেই সভায় প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দলনেতারা একসঙ্গে ঘোষণা করেন, “আমরা আমেরিকান হতে চাই না, আমরা ডেনিশও হতে চাই না, আমরা গ্রিনল্যান্ডার হতে চাই।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা বিদেশি কোনো শক্তির অধীন হতে অস্বীকারের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেছে।
বিবৃতির আরেকটি মূল অংশে বলা হয়েছে, “গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নির্ধারণ করার অধিকার একমাত্র গ্রিনল্যান্ডবাসীরই।” এ কথাটি দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ করে।
গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে ডেনমার্কের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বিশাল খনিজ সম্পদ এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক দৃষ্টির কেন্দ্রে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ এই সম্পদে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে গ্রিনল্যান্ডকে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সম্ভাবনা উত্থাপিত হয়। ট্রাম্পের এই ইঙ্গিতের পর গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিবেশে উদ্বেগের স্রোত বয়ে যায় এবং দেশীয় নেতারা দ্রুতই একত্রিত হয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়।
গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টে উপস্থিত পাঁচটি দল—সামাজিক গণতান্ত্রিক, লিবারেল, জাতীয়তাবাদী ও অন্যান্য স্বতন্ত্র গোষ্ঠী—একত্রে এই যৌথ বিবৃতি জারি করে। তাদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান স্পষ্ট করে যে কোনো বহিরাগত শক্তির চাপ বা হস্তক্ষেপ গ্রিনল্যান্ডের জনগণ মেনে নেবে না।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দ্বীপের স্বনির্ভরতা রক্ষার জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম। ডেনমার্কের সঙ্গে স্বায়ত্তশাসন চুক্তি থাকা সত্ত্বেও, গ্রিনল্যান্ডের নাগরিকরা নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অধিক স্বায়ত্তশাসন চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতের ফলে গ্রিনল্যান্ডের অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী অনুভূতি তীব্রতর হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা একত্রে জোর দিয়ে বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা ও স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
এখন গ্রিনল্যান্ডের সরকারী সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে এবং ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের পরিধি বাড়ানোর পথ অনুসন্ধান করতে হবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপ বজায় রেখে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, গ্রিনল্যান্ডের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে, উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তা কাঠামো এবং ইউরোপীয় শক্তি সমীকরণে গ্রিনল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নও তীব্র হবে।
পরবর্তী ধাপে গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো সম্ভবত ডেনমার্কের সঙ্গে স্বায়ত্তশাসন চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমর্থন অর্জনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়াবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সীমা নির্ধারণের চেষ্টা করা হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তারা কোনো বিদেশি শক্তির অধীনে না থেকে নিজেদের পরিচয় ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের স্বতন্ত্র স্বরকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যতে দ্বীপের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



