বাংলাদেশে স্নাতক সংখ্যা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, তবে নিয়োগকারীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী খুঁজে পেতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫‑এ দেশ ১৩৯টি অর্থনীতির মধ্যে ১০৬তম স্থানে, মানবসম্পদ ও গবেষণা সূচকে ১৩৩তম স্থান অর্জন করেছে।
ময়মনসিংহের এক তরুণ স্নাতক তার ডিগ্রি হাতে নিয়ে আশার আলোতে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও, চাকরির বাজারে প্রবেশের জন্য তাকে বহু মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তার মতোই দেশের বহু তরুণেরই একই ধরণের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ, যা সব শিক্ষার স্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্তমানে বেকার বাংলাদেশীর এক তৃতীয়াংশই বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক। এই সংখ্যা দেশের মানবসম্পদ ব্যবহারের দক্ষতায় বড় প্রশ্ন তুলছে।
প্রতি বছর প্রায় সাত লক্ষ নতুন স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশ করে, তবে নতুন কর্মসংস্থান মাত্র তিন লক্ষের কাছাকাছি তৈরি হয়। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বিশাল ফাঁক তৈরি হয়েছে, যা তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রত্যাশাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নিয়োগকারীরা প্রায়ই জানান, বেশিরভাগ স্নাতকের প্রযুক্তিগত, ব্যবহারিক বা যোগাযোগ দক্ষতা আধুনিক কর্মস্থলের চাহিদা পূরণে অপর্যাপ্ত। তদুপরি, দলগত কাজ, সমস্যার সমাধান এবং ডিজিটাল টুল ব্যবহারে দক্ষতার অভাবও উল্লেখযোগ্য। এই ঘাটতি সরাসরি উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলছে।
অনেক শিল্পখাতে মধ্যম ও উচ্চ দক্ষতার পদে বিদেশি পেশাজীবী নিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে। স্থানীয় স্নাতকদের তুলনায় বিদেশি কর্মীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বেশি বলে নিয়োগকারীরা তাদেরকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে দেশের দক্ষ কর্মশক্তির ওপর নির্ভরতা কমে যাচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাগুলো এই বৈষম্যের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনও তত্ত্বভিত্তিক, লেকচার-নির্ভর পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান করে, যেখানে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার সুযোগ সীমিত।
বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কলেজগুলো সম্পদ ঘাটতি, পুরোনো পাঠ্যক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব এবং শিল্পের সঙ্গে সংযোগের দুর্বলতা নিয়ে সংগ্রাম করছে। এই সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজের পরিবেশে মানিয়ে নিতে বাধা সৃষ্টি করে।
ফলস্বরূপ, স্নাতকরা স্মরণশক্তিতে পারদর্শী হলেও সমস্যার সমাধান, দলগত কাজ এবং ডিজিটাল দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে। আধুনিক কর্মস্থলে প্রয়োজনীয় এই দক্ষতাগুলো না থাকলে কর্মসংস্থান অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাপী শ্রমবাজার দ্রুত অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য শক্তি, ডিজিটাল সেবা এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও এই ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম গড়ে তুলতে ব্যর্থ।
শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা দুর্বল হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বাস্তব প্রকল্প, ইন্টার্নশিপ এবং প্রশিক্ষণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এই ফাঁক পূরণ না হলে স্নাতকদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা আরও হ্রাস পাবে।
প্রতিবেদন শেষ করে কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ দেওয়া যায়: স্নাতকরা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল স্কিল, কোডিং বা ডেটা বিশ্লেষণ শিখতে পারেন; শিল্প সংস্থার সঙ্গে ইন্টার্নশিপের জন্য সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করুন; এবং ক্যারিয়ার গঠনের জন্য সফট স্কিল, যেমন দলগত কাজ ও যোগাযোগ দক্ষতা, উন্নত করুন। এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়ক হবে।



