বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামি ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, আর্থিক লুটপাটের সংস্কৃতি দেশের ব্যাংকিং খাতে আর কখনো ফিরে আসতে দেওয়া হবে না এবং এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, একাডেমিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
গভর্নর উল্লেখ করেন, ইসলামি ব্যাংকগুলো সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে গ্রাহকদের জন্য তুলনামূলকভাবে উচ্চ মুনাফা প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে। তবে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা কিছু ব্যক্তি ও সংস্থাকে এই খাত থেকে বিশাল অর্থ লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছে। এই ধরনের অনিয়মের ফলে সেক্টরের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, ইসলামি ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতি জনগণের আস্থা এখনও অটুট রয়ে গেছে।
গত অর্থবছরে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে সর্বোচ্চ পরিমাণের আমানত প্রবাহিত হয়েছে, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি ইতিবাচক সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। পাশাপাশি, ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সহায়তার অর্থ সম্পূর্ণভাবে ফেরত দিয়ে ঋণ শোধের দায়িত্ব পালন করেছে, যা সেক্টরের আর্থিক স্বচ্ছতার প্রতি প্রতিশ্রুতি নির্দেশ করে।
ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছে। নতুন ইসলামি ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের কাজ বর্তমানে অগ্রসর রয়েছে, যা শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করে লুটপাটের সুযোগ কমাতে সহায়তা করবে। আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় শারিয়া বোর্ডের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে; বোর্ডকে আরও শক্তিশালী ও সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে এবং তার সদস্যদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ না করে কাজ করতে হবে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলামি ব্যাংকিং সেক্টরের ধারাবাহিক আমানত প্রবাহ এবং ঋণ শোধের সুদৃঢ় রেকর্ড বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করছে। লুটপাটের ঝুঁকি হ্রাস পেলে সেক্টরের ক্রেডিট রেটিং উন্নত হতে পারে, যা বিদেশি মূলধনের প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধে ত্বরিত আইনগত কাঠামো ও তদারকি প্রয়োজন, নতুবা সেক্টরের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গভর্নরের বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকারীরা ইসলামি ফাইন্যান্সের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেন। তারা উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ভূমিকা বাড়তে থাকবে এবং বাংলাদেশকে এই প্রবণতায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। তদুপরি, শারিয়া কমপ্লায়েন্সের মানদণ্ড উঁচু করা এবং প্রযুক্তি-ভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে লুটপাটের সুযোগ কমানো সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, গভর্নরের সতর্কবার্তা আর্থিক লুটপাটের পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর নীতি ও সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ইসলামি ব্যাংকিং সেক্টরের আস্থা ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা, শারিয়া বোর্ডের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। এই পদক্ষেপগুলো সেক্টরের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গঠন করবে।



