নতুন সরকার গৃহীত হলে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় কাজ হবে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি করা, এ বিষয়টি কেন্দ্রীয় নীতি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর এক সমীক্ষা থেকে স্পষ্ট হয়েছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় সিপিডি নিজস্ব কার্যালয়ে “বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং উপস্থিত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও সম্মানিত ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সহায়তা নেন।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, বর্তমান বিনিয়োগের স্থবিরতা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। উচ্চ সুদের হার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশীয় ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকে হ্রাস করছে, ফলে নতুন সরকারকে প্রথমে এই দুইটি বিষয়ের সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে।
বিনিয়োগের ঘাটতি সামাজিক বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে। সমান সুযোগের অভাবে সমাজে বিভাজন বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অশান্তির দিকে নিয়ে যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ফাহমিদা উল্লেখ করেন, বিনিয়োগ না বাড়লে বৈষম্য ও অস্থিরতা তীব্র হবে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন অংশে দেখা গিয়েছিল বিশাল প্রতিবাদ, যা মূলত কর্মসংস্থানের অভাব এবং মুদ্রাস্ফীতির তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগের ফল। তিনি বলেন, এই আন্দোলনের পেছনে মূলত বিনিয়োগের ঘাটতি এবং তার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপই কাজ করেছে।
বাজারে বেসরকারি খাতের চাকরির সুযোগ সীমিত, ফলে সরকারি চাকরিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও কোটা সংকট এবং সীমিত পদসংখ্যা রয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়কে বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে গৃহস্থালির আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফাহমিদা জোর দিয়ে বলেন, বিনিয়োগের ঘাটতি দূর না করা পর্যন্ত এই ধরনের অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।
বিনিয়োগের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে না পারলে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলি দীর্ঘমেয়াদে সমাধানহীন থাকবে, এটাই তার মূল উদ্বেগ। তিনি উল্লেখ করেন, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হলে বৈষম্য ও অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।
অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের জন্য তিনি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে তরুণ জনগোষ্ঠীকে উল্লেখ করেন। গড় বয়স ২৬ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে থাকা এই তরুণরা যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে অর্থনীতিতে নতুন গতিশক্তি সঞ্চারিত হবে।
প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি ক্ষেত্র, এবং এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি তরুণদের মধ্যে রয়েছে। ফাহমিদা বিশ্বাস করেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং তরুণদের উদ্যম একসাথে হলে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়বে।
নির্বাচন সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন পরিচালনা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী নির্বাচন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক হবে, যাতে অর্থের অপব্যবহার রোধ করা যায়।
সারসংক্ষেপে, সিপিডি নতুন সরকারের জন্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে, উচ্চ সুদের হার ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে তরুণদের উদ্যম এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তবে অর্থনৈতিক পুনরুত্থান সম্ভব।



