২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি সকালবেলায় চট্টগ্রামের চকবাজারের উর্দু গলিতে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অঞ্জলী রানী দেবীকে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একদল অপরাধী তার দিকে আগুনের শট চালিয়ে তাকে প্রাণহানি করে।
হত্যার পরপরই অঞ্জলীর স্বামী, চিকিৎসক রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী একই দিনে পাঁচলাইশ থানা-এ অজ্ঞাতপরিচয় যুবকদের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা দায়ের করেন। মামলাটি থেকে এখনো কোনো রায় না শোনা পর্যন্ত, তদন্তে একাধিক পরিবর্তন ঘটেছে।
প্রাথমিক তদন্তে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ দায়িত্ব নেয়, তবে কয়েক দিন পর নগর গোয়েন্দা পুলিশকে স্থানান্তর করা হয়। এরপর ডিবি, পিবিআই এবং অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটসহ বিভিন্ন সংস্থার তদারকি যুক্ত হয়, তবু ফলাফল শূন্যই রয়ে যায়।
সন্দেহভাজন হিসেবে প্রথমে পটিয়ার বাসিন্দা আবু সাঈদ মো. রেজা গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে জঙ্গি মামলায় কারাগারে থাকা এরশাদ হোসেন, শফিকুল ইসলাম ও মোসাবিরুল ইসলামকে একই মামলায় গ্রেফতার করা হয়। এহতেশামুল হক (ভোলা নামেও পরিচিত) নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সবাইকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে কোনো সন্দেহভাজন থেকে অঞ্জলী রানী দেবীর হত্যার সরাসরি সূত্র পাওয়া যায়নি।
পুলিশ সূত্রে বলা হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল এবং এতে চারজন যুবক অংশ নিয়েছিল। প্রতিটি যুবকের কাঁধে স্কুল ব্যাগ ছিল, যার মধ্যে তারা রামদা (এক ধরনের অস্ত্র) বহন করেছিল। অপরাধীরা অঞ্জলীকে গোপনে ব্যাগের ভেতরে নিয়ে গিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
হত্যাকারীরা ব্যাগে অঞ্জলীকে গোপন করে নিয়ে যাওয়ার পর, তাকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে দ্রুত পলায়ন করে। তদন্তকারীরা জানান, যদি অপরাধীরা চোরাচালানকারী হতো, তবে তারা অঞ্জলীর মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থ চুরি করত। তবে এই ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো সম্পত্তি চুরি করা হয়নি।
সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদে কোনো স্বীকারোক্তি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি, ফলে তদন্তে অগ্রগতি রোধে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর পরিবর্তন এবং পুনর্নিয়োগের ফলে মামলাটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অঞ্জলী রানী দেবীর পরিবার এই দীর্ঘ সময়ের অপ্রগতি নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে। স্বামী ডা. রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী জানিয়েছেন, “১১ বছরেও কোনো অগ্রগতি হয়নি, তাই বিচারের আশাও ছেড়ে দিয়েছি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, পরিবারের জন্য এই দীর্ঘ কষ্টের পরেও ন্যায়বিচার না পাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর।
অঞ্জলীর মেয়ে অর্পিতা চৌধুরীও সামাজিক মাধ্যমে তার মায়ের মৃত্যুর ন্যায়বিচারের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখে জানান, “মায়ের খুনের দায়ী অপরাধীরা কি ধরা পড়বে না?” এই প্রকাশনা পরিবারকে আরও দুঃখে ডুবিয়ে দেয়।
বর্তমান পর্যন্ত মামলাটির কোনো আদালতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি এবং কোনো সন্দেহভাজনকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। তদন্তে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার পরিবর্তন, সাক্ষ্যহীনতা এবং প্রমাণের অভাবই মূল কারণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
অধিকাংশ নাগরিক এবং মানবাধিকার সংস্থা এই মামলাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে, কীভাবে দীর্ঘ সময়ের অপ্রগতি অপরাধীর ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে তা উল্লেখ করে। তারা দাবি করে, দ্রুত এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের ধরতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
সারসংক্ষেপে, অঞ্জলী রানী দেবীর ২০১৫ সালের হত্যাকাণ্ডে এখনো পর্যন্ত কোনো বাস্তবিক অগ্রগতি হয়নি। চারজন যুবকের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হলেও, তাদের পরিচয় ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা যায়নি। পরিবার বিচারের আশায় ছেড়ে দিয়েছে, আর তদন্তের অচলাবস্থা এখনও অব্যাহত।



