স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের কার্যক্রমকে দেশের মধ্যে সফল করতে হবে বলে জোর দেন। এই মন্তব্য তিনি ৯ জানুয়ারি শুক্রবার রাতে ঢাকা শহরের একটি রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির ৩১তম বার্ষিক সম্মেলন ও বৈজ্ঞানিক সেমিনারের প্রি-কনফারেন্সে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখার সময় করেন। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ পরের দিন (শনি) এ বিষয়টি প্রকাশ করে।
প্রি-কনফারেন্সটি গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির বার্ষিক বৈজ্ঞানিক সমাবেশের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশীয় ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সোসাইটির সভাপতি ও সেক্রেটারি জেনারেলসহ বহু সদস্য উপস্থিত ছিলেন। নূরজাহান বেগমের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং রোগীর অপেক্ষা সময় কমানো।
উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে রোগীরা বিদেশে ভ্রমণ না করে দেশেই সেবা পেতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে, নূরজাহান বেগম প্রতিবেশী দেশের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভারত বছরে প্রায় পাঁচ হাজার লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন করে, আর পাকিস্তান প্রায় পাঁচশো করে। উভয় দেশের এই সংখ্যা বাংলাদেশের বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।
পাকিস্তানের একটি চিকিৎসক তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যেখানে তিনি নিজে ১২টি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে বারোটি আলাদা সেন্টারে এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন। এই তথ্য থেকে দেখা যায়, একাধিক কেন্দ্রের সমন্বয়ে ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেবা প্রদান করা সম্ভব।
নূরজাহান বেগম নেপালের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রমের কথাও উল্লেখ করেন, যদিও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ না করা হয়। নেপালের উদাহরণ দেখায় যে ছোট দেশেও এই জটিল শল্যচিকিৎসা চালু করা সম্ভব, যদি যথাযথ নীতি ও সম্পদ সমর্থন থাকে।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম মোহছেন এবং সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ডা. দেওয়ান সাইফুদ্দিন আহমেদ। উভয়ই লিভার রোগ ও ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট গবেষক ও ক্লিনিকাল বিশেষজ্ঞ।
অন্যান্য সদস্য ও দেশীয়-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি এই বিষয়ের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তারা লিভার রোগের প্রাদুর্ভাব, রোগীর বয়স গোষ্ঠী এবং পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ার নিয়ে আলোচনা করেন।
উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের মতে, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের সফলতা শুধুমাত্র শল্যচিকিৎসা নয়, বরং দাতা সংস্থার নেটওয়ার্ক, রোগীর পূর্ব-পরবর্তী যত্ন এবং আর্থিক সহায়তা ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন।
এছাড়া, তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারকে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য বিশেষ ফান্ড তৈরি করা, প্রশিক্ষণমূলক কর্মশালা আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা গ্রহণে উন্মুক্ত হতে হবে।
বৈজ্ঞানিক সেমিনারের অংশ হিসেবে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের বর্তমান প্রযুক্তি, দাতা নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং রোগীর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নিয়ে সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা আধুনিক ইমেজিং, রোবোটিক সাপোর্ট এবং ইমিউনোসাপ্রেশন থেরাপির নতুন দিকগুলো সম্পর্কে জানেন।
উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশে বর্তমানে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের সংখ্যা সীমিত, এবং রোগীর অপেক্ষার সময় দীর্ঘ। এই পরিস্থিতি উন্নত করতে সরকারী নীতি, বেসিক গবেষণা এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
নূরজাহান বেগমের শেষ মন্তব্যে তিনি দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে লিভার রোগের প্রাথমিক নির্ণয় ও প্রতিরোধে মনোযোগ দিতে আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হয়ে রোগীর জীবনমান উন্নত করতে পারবে।
এই আলোচনার পর, উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রোগীর সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। এখন প্রশ্ন রয়ে যায়, কীভাবে সরকার ও স্বাস্থ্য সেক্টর এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নযোগ্য কৌশলে রূপান্তর করবে?



