টেকনাফের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বৃহস্পতিবার রাত ৮ জানুয়ারি থেকে শনিবার সকাল ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত ধারাবাহিক গুলির আওয়াজ ও শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ শোনা গেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের হোয়াইক্যং সীমান্তে ঘটিত এই সংঘাতের শব্দ বাংলাদেশে নিকটবর্তী এপার ও টেকনাফের বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের মতে, গুলির শব্দ রাতের অন্ধকারে শুরু হয়ে প্রায় সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, কখনো থেমে যায়, আবার পুনরায় তীব্রতা বাড়ে। শোনা গুলির গর্জন ও বিস্ফোরণের ধ্বনি বাড়িগুলোকে কাঁপিয়ে তুলেছে, ফলে বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি প্রকাশ করছেন।
রহস্যময় গুলির পরিসর ও সময়সূচি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকলেও, স্থানীয় সূত্রে জানা যায় যে হোয়াইক্যং সীমান্তে ভারী অস্ত্রের ব্যবহার পুনরায় শুরু হয়েছে, যা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অঞ্চলে সামরিক কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি স্থানীয় বাণিজ্য ও মাছ ধরা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা জানান, দেশের সামরিক সরকার (জান্তা) এর নিয়ন্ত্রণ থেকে রাখাইন রাজ্যের বেশ কয়েকটি শহর, গ্রাম ও সীমান্ত চৌকি এখন আরাকান আর্মি (আর্কান সেনাবাহিনী) এর হাতে। ফলে জান্তা বাহিনীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা নিরাপত্তা শূন্যতার পরিবেশ তৈরি করেছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আরও উল্লেখ করেন, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী, আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘাত চলছে। এই ত্রিপাক্ষিক লড়াইয়ের ফলে সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় গুলির গর্জন ও বোমা বিস্ফোরণ নিয়মিত শোনা যায়।
এই পরিস্থিতি নাফ নদী ও চিংড়ি ঘেরের ওপর নির্ভরশীল মাছ ধরা সম্প্রদায়কে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। মাছ ধরতে যাওয়া জেলে রাকিব হাসান জানান, “গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের কারণে এখনো নাফ নদীর তীরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “রাখাইন সীমান্তে যেকোনো সময় গুলির ঝাঁকুনি হতে পারে, তাই আমরা ভয় পেয়ে আছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইলিয়াস মিয়া জানান, “বৃহস্পতিবার রাতের পর শুক্রবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত হোয়াইক্যং সীমান্তে ভারী বোমা বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে বাড়িঘর কাঁপে উঠেছিল।” তিনি যোগ করেন, “শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত আবারও বিস্ফোরণ শোনা গিয়েছে, এবং মাঝে মাঝে দুই-একটি গুলির আওয়াজ এখনও শোনা যায়।”
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘটনাকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার ওপর প্রভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করছেন। একটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “মিয়ানমারের রোহিংয়া সংকটের নতুন মাত্রা দেখা দিচ্ছে, যখন সীমান্তে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝড় বাংলাদেশকে প্রভাবিত করছে।”
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি শরণার্থী ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। একই সঙ্গে, জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ও ASEAN সদস্য দেশগুলো এই পরিস্থিতি নিয়ে সমন্বিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
কোয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ASEAN-র সমাবেশে মিয়ানমার সংকটের সমাধানের জন্য ত্বরিত কূটনৈতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা আশা প্রকাশ করছেন, আগামী সপ্তাহে ঢাকা ও ন্যাশনাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মধ্যে একটি উচ্চস্তরের বৈঠক হবে, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও সীমান্তে চলমান সামরিক কার্যক্রমের সমাধান নিয়ে আলোচনা হবে।
সামগ্রিকভাবে, টেকনাফের সীমান্তে তিন দিন ধারাবাহিক গুলির আওয়াজ ও বিস্ফোরণ স্থানীয় জনগণের জীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ও মানবিক সহায়তা এই সংকটের তীব্রতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



