ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি লেবাননে একটি সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে সহিংস রূপে পরিণত করার জন্য দায়ী করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশই প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে তারা ইরানের বিক্ষোভে হস্তক্ষেপ করেছে এবং এই হস্তক্ষেপই মূল কারণ বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কম, কারণ পূর্বে নেওয়া অনুরূপ পদক্ষেপগুলো ব্যর্থ হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি নিয়ে আশঙ্কা না করে, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সমাধানে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা বছরের পর বছর ধরে অবনতি ঘটিয়ে চলেছে; রিয়েলের মান হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনের ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষের সঞ্চার করেছে। এই আর্থিক চাপের ফলে ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বিভিন্ন বাজারে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের আহ্বান জানায়।
ধর্মঘটের পরই বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে এবং দ্রুতই দেশের ৩১টি প্রদেশের বেশিরভাগ শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদকারীরা মুদ্রা অবমূল্যায়ন, মুদ্রাস্ফীতি এবং মৌলিক পণ্যের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে, যা কয়েক দিনের মধ্যে দেশব্যাপী বিশাল আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।
বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে দেয়। রাজধানী তেহরানসহ প্রায় সব প্রধান শহরে সৈন্য মোতায়েন করা হয় এবং শৃঙ্খলা রক্ষার নামে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এই পদক্ষেপগুলোকে সরকার বিক্ষোভ দমন করার জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে।
বিক্ষোভের বিস্তার দেশের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। বাজার, পরিবহন ও সরকারি সেবা সবই অস্থায়ীভাবে থেমে যায়, ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ছে এবং সামাজিক অস্থিরতা তীব্রতর হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর চারবার সরাসরি সতর্কবার্তা জারি করেন। প্রতিবারই তিনি ইরানের সরকার যদি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে দমন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনা করবে বলে উল্লেখ করেন। এই সতর্কবার্তাগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পর্যন্ত ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে কোনো সরকারি মন্তব্য করেননি। তবে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ প্রকাশ্যে ইরানের জনগণের প্রতিবাদকে সমর্থন জানিয়ে থাকে, যা ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের জটিলতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরূপ পদক্ষেপগুলো ব্যর্থ হয়েছে এবং তাই ভবিষ্যতে এমন কোনো অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কম। তিনি ইরানের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ন্যায়সঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজনীয় বলে জোর দেন।
বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা এবং সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়া ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন মোড় আনতে পারে। বিশাল জনসাধারণের অস্বস্তি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা সরকারকে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে, অথবা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে রাজনৈতিক দমনকে তীব্র করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা এবং ইসরায়েলের সমর্থন ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটকে বহিরাগত শক্তির প্রভাবের অধীন করে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে ইরান-ইউএস সম্পর্কের উন্নয়ন, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন, এই বিক্ষোভের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইরানের সরকার এবং প্রতিবাদকারী উভয় পক্ষই এখনো স্পষ্ট কোনো সমঝোতা অর্জন করতে পারেনি, ফলে পরিস্থিতি অনিশ্চিত রয়ে গেছে। দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকে পরবর্তী পদক্ষেপগুলোই নির্ধারণ করবে এই আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব।



