গৃহীত ছুটির পর চট্টগ্রামের মিরসরাইতে রাত দুইটার দিকে একটি বাসে সংঘটিত দুর্ঘটনায় নাফিজ আহমেদসহ তিনজনের প্রাণ ত্যাগ হয় এবং পাঁচ থেকে ছয়জনের গুরুতর আঘাত হয়। নাফিজের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা শোকময় পরিবেশে ঘটনাস্থলকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
নাফিজ আহমেদ ছিলেন দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সর্বনিম্ন বয়সের সন্তান। শৈশব থেকেই সমুদ্রযাত্রার স্বপ্ন তাকে আকৃষ্ট করত, ফলে তিনি মাদারীপুরের ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। ভর্তি হওয়ার মাত্র তিন মাস পরই শিক্ষানবিশ প্রকৌশলী হিসেবে জাহাজে ওঠার পরিকল্পনা ছিল তার, তবে সেই স্বপ্ন দুর্ঘটনার ফলে শেষ হয়ে যায়।
শিক্ষা ক্ষেত্রের সাফল্যও নাফিজের ছিল উজ্জ্বল; তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছিলেন এবং পলিটেকনিক থেকে উত্তীর্ণ হয়ে গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। পরিবারে এই অর্জন নিয়ে আনন্দের সুর বাজে, কারণ নাফিজের বাবা নুরুল আলম চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, ফলে নাফিজও চট্টগ্রামে বসবাস করত।
দুর্ঘটনা ঘটে যখন নাফিজ এবং তার পাঁচজন সহপাঠী চট্টগ্রাম নগরের দামপাড়া থেকে বাসে চড়ে মিরসরাইয়ের পথে রওনা হন। রাতের অন্ধকারে বাসটি হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গিয়ে উল্টে যায়, ফলে নাফিজ এবং দুজন অন্য যাত্রী প্রাণ হারায়। নাফিজের সঙ্গে নিহতদের মধ্যে ছিলেন মো. হেলালের মেয়ে শাবিতুন নাহার (চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম) এবং গাইবান্ধার কাতলামারী এলাকার মৃত নয়া ব্যাপারীর ছেলে মিন্টু মিয়াও।
দুর্ঘটনায় আরও পাঁচ থেকে ছয়জন যাত্রী গুরুতর আঘাত পেয়ে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন। আহতদের অবস্থা স্থিতিশীল, তবে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে এবং দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে রেকর্ডিং ডিভাইস ও সাক্ষী বিবৃতি সংগ্রহ করছে।
নাফিজের বাবা নুরুল আলম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শোক প্রকাশ করেন। তিনি জানান, নাফিজ ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল, মাধ্যমিক পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছিলেন এবং নৌবাহিনীতে যোগদানের জন্য পাসপোর্ট তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। শীতকালীন ছুটিতে ২৯ ডিসেম্বর বাড়ি ফিরে তিনি পরিবারকে হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে বাসে চড়েছিলেন, আর সকালে তার দেহ লাশ হয়ে ফিরে আসে।
দুর্ঘটনার পর নাফিজের দেহ মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ইউনিয়নের মসজিদিয়া গ্রামে নিয়ে এসে বাড়ির সামনে রাখা হয়। স্বজন, প্রতিবেশী ও সহপাঠীরা শোকের ছায়ায় একত্রিত হয়ে দেহের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা প্রদান করেন। জুমার নামাজের পর দেহের উপর জানাজা সম্পন্ন হয় এবং পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
নাফিজের ভগ্নিপতি মোবারক হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশের কাছে মামলা দায়ের করেন। তিনি দুর্ঘটনার দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে তদন্তের ত্বরান্বিত হওয়ার আহ্বান জানান।
পুলিশ বর্তমানে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয়ের জন্য রাস্তায় গাড়ির গতি, ব্রেকের অবস্থা এবং চালকের আচরণসহ বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করছে। প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে রাত্রিকালীন অন্ধকার এবং রাস্তায় অপ্রতুল আলোকসজ্জা দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও সাক্ষী বিবৃতি প্রয়োজন।
এই দুঃখজনক ঘটনা স্থানীয় সমাজে গভীর শোকের ছাপ ফেলেছে। নাফিজের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এক মুহূর্তে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে, আর পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের জন্য এটি একটি অম্লান ক্ষতি। কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত তদন্তের প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা যায়।



