কিয়েভের একটি ওয়াইন বারে শনিবার রাতের খাবার শেষে ৩৪ বছর বয়সী দারিয়া মোবাইল ফোনে ডেটিং অ্যাপ খুলে স্ক্রোল করেন, তারপর ফোনটি টেবিলে রেখে দেন। তিনি জানান, যুদ্ধের আগে শেষবারের মতো কোনো সঠিক ডেটের সুযোগ পেয়েছেন না। চার বছর ধরে চলমান পূর্ণ-স্কেল আক্রমণ ইউক্রেনীয়দের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব দিক পরিবর্তন করেছে; সম্পর্ক ও সন্তান পরিকল্পনা এখন বিশেষভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফলে দেশের বিবাহ ও জন্মহার হ্রাস পাচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ২০২২ সালে লক্ষ লক্ষ ইউক্রেনীয় নারী বিদেশে পাড়ি দিয়ে নতুন জীবন গড়ে তুলেছেন, আর শত হাজারেরও বেশি পুরুষ সামরিক সেবা বা বিদেশে বসবাসের কারণে দেশের বাইরে। যারা দেশে রয়ে গেছেন, তাদের জন্য সঙ্গী খুঁজে পরিবার গড়ার সম্ভাবনা ক্রমশ দূরবর্তী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লভিভে ২৮ বছর বয়সী ক্রিস্টিনা একই অনুভূতি ভাগ করে নেন। তিনি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সঙ্গী খোঁজার চেষ্টা করছেন, তবে পুরুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সফলতা কম। তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধের সময়সীমা ও কনসার্পশন স্কোয়াডের উপস্থিতি অনেক তরুণকে বাড়ির ভেতরে আটকে রাখে, ফলে তারা বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকে। এই পরিস্থিতি কেবল সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে; সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ট্রমা ও মানসিক চাপের মাত্রা বাড়ে, বিশেষ করে যারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছে।
দারিয়া তিনটি প্রকারের পুরুষকে সম্ভাব্য সঙ্গী হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রথমে এমন লোকজন যারা কনসার্পশন এড়াতে বাড়িতে আটকে থাকে; তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়া কঠিন। দ্বিতীয় গোষ্ঠী হল সৈন্য, যাদের সঙ্গে দূরত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, তবে ফ্রন্টলাইন থেকে বিরল ভিজিটের পর আবার বিচ্ছিন্নতা আসে। তৃতীয় বিকল্পের বিশদ তিনি প্রকাশ না করলেও, তিনি উল্লেখ করেন যে বিকল্পগুলো সীমিত এবং প্রত্যাশা কমে যাচ্ছে।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ইউক্রেনের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক প্রবণতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে থেকেই বিবাহের হার এবং জন্মহার হ্রাস পাচ্ছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা তীব্রতর হয়েছে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ আছে যে, যুদ্ধের ফলে দেশের প্রজনন সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শ্রমশক্তি ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই জনমিতিক চ্যালেঞ্জকে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উল্লেখ করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবিক সহায়তা নীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের শেষের পর পুনরায় পরিবার গড়ে তোলার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, ইউক্রেনের সরকারও সামরিক দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে এমন পুরুষদের জন্য পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান প্রোগ্রাম চালু করেছে, যাতে তারা সমাজে পুনরায় সংযুক্ত হতে পারে।
তবে বাস্তবতা এখনও কঠিন। ডেটিং অ্যাপের ব্যবহার বাড়লেও, নিরাপত্তা উদ্বেগ, আর্থিক অস্থিরতা এবং মানসিক আঘাতের কারণে অনেক নারী নতুন সম্পর্ক গড়তে দ্বিধা করে। ক্রিস্টিনার মতই, লভিভের তরুণীরা প্রায়ই বাড়ির ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে কনসার্পশন স্কোয়াডের উপস্থিতি তাদের চলাচলকে সীমাবদ্ধ করে। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্যও দীর্ঘ সময়ের ফ্রন্টলাইন ডিউটি এবং ঘন ঘন মানসিক আঘাতের ফলে স্থায়ী সম্পর্ক গড়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সামগ্রিকভাবে, ইউক্রেনের বর্তমান সামাজিক পরিবেশে প্রেম, বিবাহ এবং সন্তান পরিকল্পনা একটি দূরবর্তী স্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের দীর্ঘায়ু ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন একসঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনকে প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা, সরকারী নীতি এবং সামাজিক পুনর্গঠন উদ্যোগগুলোই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মূল চাবিকাঠি হতে পারে।



