উত্তর আমেরিকায় ইল্ম গাছের পাতা ক্ষতিগ্রস্ত করে একটি নতুন কীটের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। এই কীটটি প্রায় এক সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের, শুধুমাত্র মেয়ে সন্তান উৎপন্ন করে এবং পুরুষের কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। গবেষকরা এটিকে এল্ম জিগজ্যাগ স্যাফাইল (Aproceros leucopoda) নামে চিহ্নিত করেছেন।
এই প্রজাতি প্রকৃতপক্ষে মাছি নয়, বরং একধরনের ওয়াস্পের অন্তর্ভুক্ত, যা ২০২০ সালে উত্তর আমেরিকায় প্রথম নথিভুক্ত হয়। মূলত পূর্ব এশিয়া থেকে আগত এই কীটটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে, যা জার্নাল অফ ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্টে প্রকাশিত গবেষণায় ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তর আমেরিকায় প্রথমবারের মতো দেখা যাওয়ার পর থেকে মাত্র পাঁচ বছরেই এই কীটটি ১৫টি যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে মিনেসোটা পর্যন্ত উত্তরের রাজ্যগুলো, দক্ষিণে নর্থ ক্যারোলাইনা এবং সম্প্রতি যুক্ত হওয়া ইন্ডিয়ানা পর্যন্ত এর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। গবেষকরা এই তথ্যের ভিত্তিতে একটি মানচিত্র তৈরি করে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইল্ম গাছের পাতা ক্ষতিগ্রস্ত করার পদ্ধতি বিশেষভাবে নজরকাড়া। নবজাতক লার্ভা যখন প্রথমে পাতা খায়, তখন তারা পাতায় জিগজ্যাগ প্যাটার্নে কাট তৈরি করে, যা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও পরবর্তীতে লার্ভা বড় হলে গাছের পাতা ব্যাপকভাবে ছিঁড়ে ফেলতে পারে, ফলে গাছ প্রায় শূন্য পাতায় রূপান্তরিত হয়।
এই কীটের আক্রমণ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ অনেক শহর এখনও ডাচ ইল্ম রোগের পরিণতিতে হারিয়ে যাওয়া ইল্ম গাছের পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ডাচ ইল্ম রোগের ফলে গত শতাব্দীতে লক্ষ লক্ষ আমেরিকান ইল্ম গাছ মারা গিয়েছিল, এবং এখন এই নতুন কীটটি দ্বিতীয় ধরণের হুমকি হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে।
গবেষক দলটি জেলকোভা গাছের উপরও এই কীটের প্রভাব পরীক্ষা করেছে। জেলকোভা (Zelkova serrata) ইল্মের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং ডাচ ইল্ম রোগের প্রতি অধিক প্রতিরোধী বলে শহরগুলোতে প্রায়ই রোপণ করা হয়। ওহাইওতে একটি সংক্রমিত এলাকায় জেলকোভা চারা রোপণ করে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পর্যবেক্ষণের ফলাফল দেখায় যে জেলকোভা গাছের নতুন পাতা ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এই কীটটি ডিম পাড়ে, লার্ভা খায়, পিউপা গঠন করে এবং প্রাপ্তবয়স্ক রূপে বেরিয়ে আসে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীটটি আবার ইল্ম গাছে ফিরে আসে, যা ইঙ্গিত দেয় যে জেলকোভা শুধুমাত্র একটি বিকল্প হোস্ট হিসেবে কাজ করে, মূল হোস্ট ইল্মই রয়ে যায়।
এই পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে কীটটি শুধুমাত্র ইল্ম গাছেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইল্মের নিকট আত্মীয় গাছেও জীবনচক্র সম্পন্ন করতে সক্ষম। ফলে শহুরে বাগান ও পার্কে জেলকোভা রোপণকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়।
শহর পরিকল্পনাকারী ও বাগান সংরক্ষণকারী সংস্থাগুলোর জন্য এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইল্ম গাছের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় এখন অতিরিক্ত ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে। ডাচ ইল্ম রোগের পরিপূরক হিসেবে জেলকোভা রোপণ করা হলেও, নতুন কীটের উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের মতে, এই কীটের বিস্তার রোধে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বর্তমানে গবেষকরা কীটের প্রজনন চক্র, শত্রু প্রাকৃতিক শত্রু এবং সম্ভাব্য রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শহরগুলোতে ইতিমধ্যে কিছু প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন আক্রান্ত গাছের দ্রুত ছাঁটাই এবং পোকা ধ্বংসকারী জাল ব্যবহার। তবে এই পদ্ধতিগুলি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে কিনা তা এখনও পর্যবেক্ষণাধীন।
সামগ্রিকভাবে, ইল্ম জিগজ্যাগ স্যাফাইলের দ্রুত বিস্তার উত্তর আমেরিকায় নগর গাছের স্বাস্থ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে। গবেষণার ফলাফল নির্দেশ করে যে এই কীটের হোস্ট পরিসর বিস্তৃত হতে পারে, তাই ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
শহর পরিকল্পনাকারী, বাগান প্রেমিক ও পরিবেশ সংরক্ষণে জড়িত সবাইকে এই নতুন হুমকির প্রতি সতর্ক থাকতে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। আপনার এলাকার গাছের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কীভাবে নজর রাখবেন, তা নিয়ে আপনি কি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন?



