শুক্রবার বিকেলে যশোর সদর উপজেলার পাচবাড়িয়া গ্রামে ঐতিহ্যবাহী গরু গাড়ি দৌড়ের আয়োজন করা হয়। শীতের মৃদু বাতাসে মিষ্টি রোদের আলোর ছোঁয়া মাঠকে সোনালি রঙে রাঙিয়ে তুলেছে। স্থানীয় কৃষকরা বোরো ধান চাষের জন্য প্রস্তুত করা বিশাল মাঠকে দৌড়ের ট্র্যাক হিসেবে সাজিয়ে, গ্রামবাসীর উচ্ছ্বাসে পূর্ণ একটি অনুষ্ঠান তৈরি করেন।
এই গরু গাড়ি দৌড়ের ঐতিহ্য কমপক্ষে দুই দশক ধরে চালু রয়েছে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি বছর একই সময়ে গ্রামবাসী ও আশেপাশের লোকজন একত্রিত হয়ে এই প্রতিযোগিতা উপভোগ করে, যেখানে গরুর গাড়ি দ্রুতগতিতে মাঠের মাঝখানে নির্ধারিত দূরত্ব অতিক্রম করে।
দৌড়ের দিন মাঠে উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছায়। বিভিন্ন বয়সের মানুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত, সবই একত্রে উৎসবের মেজাজে মেতে ওঠে। গরু গাড়ি দৌড়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলায় রঙিন তম্বুর, পেঁয়াজু-পাপড় ভাজি, বিভিন্ন হস্তশিল্পের স্টল এবং স্থানীয় খাবারের বিক্রয় হয়, যা দর্শকদের জন্য অতিরিক্ত আকর্ষণ তৈরি করে।
মেলার পরিবেশে বড় বড় ছাতা, পুতুলের ঘোড়া, জাম্পিং ডবল, ঘুরলি ঘোড়া এবং বিভিন্ন ধরণের নাগরদোলা সাজানো থাকে। ছোট ও বড় উভয় বয়সের শিশুদের জন্য এই রাইডগুলো আনন্দের স্রোত বয়ে আনে, আর বিক্রেতারা তাদের পণ্য দিয়ে মেলাটিকে রঙিন করে তোলেন।
মেলার প্রধান অংশগ্রহণকারী বিক্রেতাদের মধ্যে এনায়েতপুরের ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ ইবাদ আলী ও তার পরিবারও ছিলেন। তারা পরিবারসহ মেলায় এসে গরু গাড়ি দৌড় দেখার পাশাপাশি বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করেন। ইবাদ আলী মেলার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশংসা করে বলেন, “এখানে আইনশৃঙ্খলা ভাল, সবাই আনন্দে মেতে উঠেছে।”
বিগড়ের সুবোধ দেবনাথ দুপুরের পর মেলায় শিশুদের খেলনা বিক্রির জন্য স্টল স্থাপন করেন। তিনি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় এক হাজার টাকা বিক্রি করে মেলার বাণিজ্যিক দিককে সমর্থন করেন। দেবনাথ উল্লেখ করেন, “গরু গাড়ি দৌড়ের গাড়োয়ানদের মাধ্যমে মেলায় পৌঁছাই, এবং এখানে ব্যবসা ভালো হয়।”
ঝিনাইদহের সুমন কুমার বিশ্বাস নাগরদোলা নিয়ে মেলায় উপস্থিত হন। তিনি প্রথমবারের মতো এখানে এসে আনন্দের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সাথী খাতুন তিন সন্তানসহ মেলায় অংশ নেন এবং তাদের দুজনকে নাগরদোলায় চড়িয়ে আনন্দ ভাগ করেন।
মেলায় উপস্থিত সবার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মেলার চারপাশে পর্যাপ্ত গার্ড রাখে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে। এই ব্যবস্থা দর্শকদের নিরাপদে দৌড় ও মেলা উপভোগ করতে সহায়তা করে।
গরু গাড়ি দৌড় এবং মেলার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই উৎসবটি গ্রাম্য সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ। ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প এবং রোমাঞ্চকর রাইডের সমন্বয়ে তৈরি এই মেলা, যশোরের গ্রামবাসীর গর্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়া, গ্রাম্য জীবনের রঙিন দিকগুলোকে সংরক্ষণ করার অন্যতম উপায়।
যারা গ্রাম্য সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা এবং রঙিন মেলায় আগ্রহী, তাদের জন্য এই ধরনের অনুষ্ঠান একটি চমৎকার সুযোগ প্রদান করে। গরু গাড়ি দৌড়ের রোমাঞ্চ, মেলার রঙিন পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তা একসাথে মিলিয়ে একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা প্রত্যেক দর্শকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়।



