সুদানের গৃহযুদ্ধের প্রথম ১,০০০ দিন পার হওয়ার পর দেশটি বিশাল মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে; আন্তর্জাতিক সংস্থা অনুযায়ী বর্তমানে ৩ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ তীব্র অনাহারের মুখোমুখি। এই সংকটের মূল কারণ দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘর্ষ এবং বিশ্বব্যাপী মানবিক তহবিলের হ্রাস।
যুদ্ধটি ২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হয়, যখন দেশের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF) একে অপরের সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। দশ মাসের বেশি সময় ধরে চলমান এই সংঘর্ষ সুদানের জনসংখ্যার অধিকাংশকে সরিয়ে নিয়ে গেছে এবং দেশের অবকাঠামোকে ধ্বংস করেছে।
ইসলামিক রিলিফের একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, সুদানের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য ঘাটতির শিকার। বিশেষ করে উত্তর দারফুরে শিশুদের অপুষ্টির হার বিশ্বে রেকর্ডের শীর্ষে রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
গেদারেফ ও দারফুর অঞ্চলের ৮৩ শতাংশ পরিবার পর্যাপ্ত খাবার পেতে পারছে না। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার ফলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হাসপাতাল অচল অবস্থায় রয়েছে, ফলে প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ মৌলিক চিকিৎসা সেবা ছাড়া বেঁচে আছে।
অবস্থানহীন শিবিরে বসবাসকারী শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, পরিষ্কার পানি এবং স্যানিটেশন সুবিধার অভাব রয়েছে; ফলে সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার হার দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মানবিক জরুরি সহায়তার চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক তহবিলের ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বতন প্রশাসন মানবিক সহায়তার বাজেট কাটার ফলে সুদান গাজা, ইউক্রেন ও মিয়ানমারের মতো অন্যান্য সংঘর্ষপূর্ণ অঞ্চলের সঙ্গে তহবিলের প্রতিযোগিতায় পড়েছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মানবিক আবেদন অনুযায়ী, দাতা দেশগুলোর অবদান হ্রাসের ফলে ২০২৬ সালের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র অর্ধেক, অর্থাৎ ২৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘাটতি সরাসরি কয়েক কোটি শরণার্থীর মৌলিক সেবা বন্ধ করে দিচ্ছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “সুদানের মানবিক সংকট এখন কেবল স্থানীয় নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, কারণ তহবিলের অভাবে মৌলিক সেবা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।” এই মন্তব্যটি বর্তমান তহবিল সংকটের প্রভাবকে তুলে ধরে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কিছু গৌণ দাতা দেশ ত্বরিত আর্থিক সহায়তা প্রদান করার আহ্বান জানিয়েছে, তবে বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চলছে। তদুপরি, মানবিক সংস্থাগুলো নিরাপদ প্রবেশের পথ নিশ্চিত করতে এবং সহায়তা বিতরণে বাধা সৃষ্টি করা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতা চায়।
অবস্থা উন্নত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ত্বরিতভাবে তহবিল বাড়াতে হবে এবং সুদানের মানবিক জরুরি প্রয়োজনের জন্য অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। তাছাড়া, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য রাজনৈতিক আলোচনায় গৃহযুদ্ধের মূল কারণগুলো সমাধান করা অপরিহার্য।
সুদানের বর্তমান সংকটকে গাজা, ইউক্রেন ও মিয়ানমারের মতো অন্যান্য সংঘর্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়; তবে প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন, যা তহবিলের বণ্টনকে জটিল করে তুলছে। তবু, মানবিক সহায়তার ন্যায্যতা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক নীতির মৌলিক দায়িত্ব।
সংক্ষেপে, সুদানের মানবিক সংকটের মাপ বাড়ছে, তহবিলের ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ধ্বংসের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৌলিক জীবনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপই এই সংকটের সমাধানে একমাত্র সম্ভাব্য পথ।



