পটুয়াখালীর কলাপাড়া দক্ষিণ টিয়াখালী (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত জাহান সোনিয়া, ২০১৮ সালের আগস্টে একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করার পর গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে ১৪ দিন জেলখানায় কাটাতে বাধ্য হন। পোস্টটি শেয়ার করার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭(২) ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়।
সেই সময়ে, ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ চলছিল। ৩ আগস্ট নুসরাত ফেসবুকে অন্যের একটি পোস্ট শেয়ার করেন, যা পরে পুলিশ কর্তৃক ‘অবৈধ তথ্য প্রচার’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ৪ আগস্ট মধ্যরাতে তাকে কলাপাড়া থানাে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরের দিন আইসিটি আইনের অধীনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ রেজিস্টার করা হয়।
অপরাধের অভিযোগে বলা হয়, পোস্টে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয়পত্র রাখা, পুলিশের নজরদারি এড়াতে আত্মরক্ষার জন্য ব্যাগে মরিচের গুঁড়া বা ছোট ইটের টুকরা রাখার পরামর্শ দেওয়া ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ৬ আগস্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহীদুল ইসলামের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে নুসরাতকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
গ্রেপ্তারকালে নুসরাতের স্বামী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তার দু’টি মোবাইল ফোন ও একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। জেলখানায় ১৪ দিন কাটানোর পর তাকে রিলিজ করা হয়, তবে গর্ভাবস্থার শেষ মাসে জেলখানার শর্তে থাকা তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ে।
নুসরাতের গর্ভধারণের সময় শিশুটি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ছিল; এখন সেই শিশুর বয়স সাত বছরের বেশি। মা‑বাবা দুজনই এই ঘটনার পর দীর্ঘকালীন আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। মামলাটি ৭ বছর ৪ মাস ২৩ দিন চলার পর অবশেষে নুসরাতকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
মামলার সমাপ্তি ঘটার আগে, গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার উম্মে সাহারা লাইজুর স্বাক্ষরিত চিঠিতে নুসরাতের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বরখাস্তের সময়কালকে চাকরির সেবা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সেই সময়ের বেতনবিলম্ব বকেয়া হিসেবে প্রদান করা হবে।
চিঠির নির্দেশ অনুসারে নুসরাত ২৯ ডিসেম্বর পুনরায় দফতরে যোগ দেন। পুনরায় কাজ শুরু করার পর তিনি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করে বেতন গ্রহণের পাশাপাশি অন্যান্য দায়িত্বে দ্রুত ফিরে আসেন। তবে জব্দ করা মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপের ফেরত পাওয়ার জন্য তাকে পৃথকভাবে আবেদন করতে হবে, যা এখনও সম্পন্ন হয়নি।
এই ঘটনার পর নুসরাতের সন্তানকে গর্ভে রাখার সময় জেলখানায় কাটানো দিনগুলো তার মানসিক দিক থেকে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি নিজের মায়ের কাছে জিজ্ঞাসা করেন, “মাকে গর্ভে রেখে কেন জেলখাটতে হলো?” এমন প্রশ্ন তার অভিজ্ঞতার গভীরতা প্রকাশ করে।
আইনি দিক থেকে, নুসরাতের বিরুদ্ধে দায়ের করা আইসিটি আইনের ধারা ৫৭(২) অনুযায়ী ‘অবৈধ তথ্যের প্রচার’ এবং ‘সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন’ ইত্যাদি অভিযোগ ছিল। তবে আদালত শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে প্রমাণ অপর্যাপ্ত বলে মামলাটি বাদ দেয়।
বর্তমানে নুসরাত পুনরায় শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন এবং তার বেতনবিলম্বের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিভাগ থেকে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। তিনি এবং তার স্বামী জব্দকৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফেরত পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আবেদনপত্র প্রস্তুত করছেন, যা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই ঘটনা সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার, শিক্ষকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইসিটি আইনের প্রয়োগের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে, গর্ভবতী নারীর অধিকার ও শারীরিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা পুনরায় উন্মোচিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এধরনের মামলায় আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে ন্যায়সঙ্গত ও মানবিকভাবে পরিচালিত হবে, তা নজরে থাকবে।



