যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের মন্তব্যের পর ভারত সরকার চুক্তি আলোচনার বর্তমান অবস্থা ও দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের সঠিক চিত্র তুলে ধরেছে। লুটনিকের মতে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি আটকে যাওয়ার প্রধান কারণ হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ না করা। তবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রন্ধির জয়সওয়াল এই বক্তব্যকে ‘অসত্য’ বলে খণ্ডন করে, এবং দুই দেশের আলোচনার অগ্রগতি ও চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাবের ওপর আলোকপাত করেছেন।
লুটনিকের মন্তব্য একটি পডকাস্টে প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে চুক্তি শেষ পর্যায়ে ছিল এবং একমাত্র বাধা ছিল মোদির ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি ফোন কল না করা। তিনি যুক্তি দেন যে ভারতীয় পক্ষ এই পদক্ষেপে অস্বস্তি বোধ করেছিল, ফলে কলটি না হওয়ায় চুক্তি আটকে যায়। এই বক্তব্যের পর হোয়াইট হাউস থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভারতীয় সরকার লুটনিকের মন্তব্যকে ‘অসঠিক’ বলে জানিয়ে, ২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই দেশই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছে বলে জোর দেয়। রন্ধির জয়সওয়াল উল্লেখ করেন যে, এই সময়কালে বহুবার আলোচনার রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি সময়ে চুক্তি স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এছাড়া, তিনি যোগ করেন যে মোদি ও ট্রাম্প গত বছর আটবার ফোনে কথা বলেছেন, যেখানে উভয় পক্ষের বিস্তৃত অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিক আলোচনা হয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তি আলোচনার মূল বাধা হিসেবে কৃষি ক্ষেত্রকে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় কৃষি বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে চায়, যেখানে ভারতীয় সরকার তার কৃষক ও স্থানীয় উৎপাদন রক্ষার জন্য কঠোর নীতি অনুসরণ করে। এই পার্থক্যই চুক্তির অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, ভারতীয় কৃষি পণ্যের বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে উভয় দেশের রপ্তানি-আমদানি ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হবে, তবে ভারতীয় সরকার স্থানীয় কৃষকদের সুরক্ষার জন্য শুল্ক ও নিয়মকানুন বজায় রাখতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
অগাস্টে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০% শুল্ক আরোপ করে, যার মধ্যে রাশিয়ান তেল ক্রয়ের জন্যও শাস্তি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পদক্ষেপটি আলোচনার স্থবিরতার পর নেওয়া হয় এবং বাণিজ্যিক চাপ বাড়িয়ে চুক্তি পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়। তবে শুল্কের প্রয়োগের ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারক ও আমদানি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তীব্র প্রভাব পড়েছে, বিশেষ করে গৃহস্থালী পণ্য ও প্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রে।
বর্তমানে উভয় পক্ষই চুক্তি পুনরায় আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে চূড়ান্ত স্বাক্ষরের সময়সীমা এখনও অনির্ধারিত। পূর্বে নির্ধারিত অনানুষ্ঠানিক সময়সীমা বেশ কয়েকবার অতিক্রান্ত হয়েছে, যা ব্যবসা ও বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক সংস্থাগুলো চুক্তির ফলাফলকে নির্ভরশীল করে পরিকল্পনা তৈরি করে থাকে, ফলে এই অনিশ্চয়তা তাদের বিনিয়োগ ও সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে।
লুটনিকের ‘স্টেয়ারকেস’ রূপকটি যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি নীতি ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেন প্রথম ধাপে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুক্তরাজ্যের পরে ভারতকে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন, এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দিল্লিকে তিনটি শুক্রবারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। যদিও এই প্রস্তাবের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রকাশিত হয়নি, তবু এটি চুক্তি আলোচনার গতি বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়।
বাণিজ্য চুক্তি পুনরায় চালু হলে উভয় দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে নতুন গ্রাহক ভিত্তি গড়ে তোলা এবং উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হবে, আর ভারতীয় শিল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়বে। তবে কৃষি ও শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়গুলো সমাধান না হলে চুক্তি সম্পন্ন হওয়া কঠিন হতে পারে।
সংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রীর মন্তব্য এবং ভারতের প্রতিক্রিয়া বাণিজ্য চুক্তি আলোচনার জটিলতা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা তুলে ধরে। উভয় পক্ষই চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তবে কৃষি সেক্টরের রক্ষার বিষয়টি সমাধান না হলে চুক্তি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে পারে না। ভবিষ্যতে চুক্তি সম্পন্ন হলে উভয় দেশের বাণিজ্যিক প্রবাহ বাড়বে, তবে বর্তমান অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও বাজারের স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি করে রাখবে।



