যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করে নেওয়ার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে দ্বীপের প্রতিটি বাসিন্দাকে এককালীন নগদ অর্থ প্রদান করার পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন। এই আলোচনার সূত্রে জানানো হয়েছে যে, প্রস্তাবিত পরিমাণ প্রতি ব্যক্তি ১০,০০০ ডলার থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যেখানে প্রায় ৫৭,০০০ মানুষ বসবাস করে। হোয়াইট হাউসের এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য হল দ্বীপটি ডেনমার্ক থেকে আলাদা করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করা, যা দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ডেনমার্কের সরকার এবং কোপেনহেগেনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, গ্রিনল্যান্ডের বিক্রয় বা কোনো আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অধিগ্রহণের কোনো ইচ্ছা নেই। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, দ্বীপের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ডেনমার্কের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
হোয়াইট হাউসে চলমান আলোচনায় ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের বিভিন্ন কৌশলগত বিকল্প মূল্যায়ন করছেন। নগদ অর্থ প্রদানের পাশাপাশি, সামরিক উপস্থিতি বা অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই ধরনের পরিকল্পনা ব্যবসায়িক লেনদেনের মতো দেখাতে পারে, যা গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের জন্য অবমাননাকর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডের মানুষ স্বায়ত্তশাসন ও ডেনমার্কের ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত, তাই এমন কোনো প্রস্তাবের প্রতি সংবেদনশীলতা স্বাভাবিক।
ট্রাম্পের এই ধারণা ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কোপেনহেগেনের পাশাপাশি প্যারিস, বার্লিন, রোম, ওয়ারশ, মাদ্রিদ এবং লন্ডনের সরকারী কর্মকর্তারা এই বিষয়কে ডেনমার্কের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
নাটোর মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এই আলোচনাকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা দীর্ঘদিনের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, ফলে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো একতরফা পদক্ষেপ উভয় পক্ষের কূটনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
গত মঙ্গলবার ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন, যুক্তরাজ্য এবং ডেনমার্ক একত্রে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে জানায় যে, গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পারস্পরিক সম্পর্কের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র উভয় দেশের স্বায়ত্তশাসিত স্বার্থের ভিত্তিতে নেওয়া হবে। এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বায়ত্তশাসন নীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ইঙ্গিত দেয়।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে। লেভিট স্বীকার করেছেন যে, ট্রাম্পের দল সম্ভাব্য ক্রয় পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও নির্দিষ্ট সময়সীমা বা শর্তাবলী এখনো প্রকাশিত হয়নি।
প্রেস ব্রিফিংয়ে রুবিওরও মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো এবং ডেনমার্কের সংবিধানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, কোনো সিদ্ধান্তের আগে সব সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত সংগ্রহ করা অপরিহার্য।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র নগদ অর্থের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের পথে অগ্রসর হয়, তবে তা কূটনৈতিক আলোচনার নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে। পরবর্তী ধাপে ডেনমার্কের সরকারী অনুমোদন, স্থানীয় জনগণের মতামত এবং ন্যাটো সংস্থার অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন হবে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার সম্ভাব্য উপায় হিসেবে প্রতিটি বাসিন্দাকে সর্বোচ্চ এক লাখ ডলার প্রদান করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ডেনমার্কের স্পষ্ট বিরোধ, ইউরোপীয় দেশগুলোর সমন্বিত প্রতিক্রিয়া এবং ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামো এই প্রস্তাবকে জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই আলোচনা অগ্রসর হবে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ তৈরি করবে।



