বৃহস্পতিবার রাতের দিকে মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের সীমানা পারাপার নাফ নদের হোয়াইক্যং এলাকায় এক বাংলাদেশি জেলে গুলির শিকার হন। শিকারের নাম মো. আলমগীর, যিনি টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বালুখালী গ্রাম থেকে এসেছেন। গুলির আঘাত তার বাম হাতে লেগে রক্তপাত শুরু হয় এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গেই নিকটস্থ উখিয়া কুতুপালং এমএমএস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
স্থানীয় প্রশাসন গুলির পরিপ্রেক্ষিতে জেলে ও আশেপাশের বাসিন্দাদের সতর্কতা জানিয়ে দেয় যে, গুলির গর্জন শোনা গেলে সরাসরি নিরাপদ স্থানে ফিরে আসতে হবে এবং সীমান্তে কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম উল্লেখ করেন, গুলির শিকার হওয়ার পর থেকে সীমান্তে টহল বাড়ানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু জানান, রাখাইন সীমান্তে মাঝে মাঝে গুলির শব্দ শোনা যায় এবং আজও কয়েকটি গুলির এবং বিস্ফোরণের শব্দ রেকর্ড করা হয়েছে। এই ধরনের ঘটনা স্থানীয় জেলেদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, বিশেষ করে যারা নাফ নদে মাছ ধরতে যান।
আহত জেলের বড় ভাই সরওয়ার আলমের মতে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আলমগীর ও মো. আকবর নাফ নদের হোয়াইক্যং এলাকার বিলাইচ্ছর দ্বীপের নিকটে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। নৌকায় জাল ফেলতে গিয়ে হঠাৎ গুলির শব্দ শোনা যায় এবং আলমগীরের নৌকার ভিতরে গুলি লুটিয়ে পড়ে। গুলিটি তার বাম হাতে প্রবেশ করে, ফলে রক্তপাত শুরু হয় এবং সহযাত্রীদের সাহায্যে তাকে তৎক্ষণাৎ উদ্ধার করা হয়।
বিকাশের পর, আলমগীরকে প্রথমে উখিয়া কুতুপালং এমএমএস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে তার অবস্থা উন্নত করার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। উখিয়া ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম জানান, নাফ নদে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা জানার পর সীমান্তে টহল বাড়ানো হয়েছে এবং বর্তমানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নাফ নদে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কিছু জেলে সেখানে গিয়ে কাজ করছেন, যা নিয়ন্ত্রণের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে ২৭ ডিসেম্বর থেকে চলমান সংঘাতের ফলে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় একাধিকবার বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়। এই সংঘাতের মূল কারণ হল রাখাইন রাজ্যের জাতিগত ও ধর্মীয় উত্তেজনা, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রাখাইন সংঘাতের পরিণতি শুধুমাত্র মিয়ানমারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিবেশী বাংলাদেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। নাফ নদের মতো সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে গুলির শিকার হওয়া স্থানীয় জনগণের জীবিকায় প্রভাব ফেলছে এবং সীমান্তে শরণার্থী প্রবাহের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা (UNOCHA) রাখাইন অঞ্চলে চলমান সহিংসতার কারণে মানবিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে এবং বাংলাদেশকে সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইন সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক সংলাপ ও শান্তি প্রক্রিয়ার ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানাচ্ছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, এই ধরনের ঘটনা দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও শরণার্থী নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সীমান্তে গুলির শিকার রোধে যৌথ পর্যবেক্ষণ দল গঠন এবং শরণার্থী রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে।
অধিকন্তু, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে, এই ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর (যেমন SAARC) সমন্বিত প্রতিক্রিয়া প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। বিশ্লেষকরা পরামর্শ দেন, রাখাইন সংঘাতের সমাধানে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা এবং মানবিক সহায়তা সংহত করে একটি সমন্বিত কৌশল গৃহীত হওয়া উচিত।
সর্বশেষে, স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নাফ নদের আশেপাশে গুলির শব্দ শোনা যায়, যা সীমান্তে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের অব্যাহত উপস্থিতি নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে গুলির শিকার রোধে আরও কঠোর টহল, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য বলে অনুমান করা হচ্ছে।



