যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার গ্রিনল্যান্ডের প্রতিটি নাগরিককে ১০,০০০ ডলার থেকে এক লাখ ডলার পর্যন্ত নগদ প্রস্তাবের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। এই পরিকল্পনা হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ মিটিং থেকে উঠে এসেছে এবং গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আনতে লক্ষ্যভেদ করে।
রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, আমেরিকান কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ডের ৫৭,০০০ জনসংখ্যার ওপর সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে দ্বীপের স্বার্থ অর্জনের কৌশল গড়ে তুলছেন। প্রস্তাবিত পরিমাণ ১০,০০০ ডলার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ এক লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা স্থানীয় জনগণের মনোভাব পরিবর্তনে ব্যবহার করা হবে বলে ধারণা।
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব এবং সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ডেনমার্কের অধীনে থাকা এই বৃহৎ আর্কটিক অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর সম্ভাবনা রাখে, বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে।
ডেনমার্ক সরকার এবং গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের কর্তৃপক্ষ বারবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো ইচ্ছা নেই এবং দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কাজ করা হবে।
ডেনিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে। সামরিক হুমকি মোকাবেলায় ডেনমার্কের সেনাবাহিনীর নির্দেশনা “আগে গুলি, পরে প্রশ্ন” হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে, যা সম্ভাব্য সংঘর্ষে ডেনমার্কের প্রস্তুতি নির্দেশ করে।
আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি হোয়াইট হাউস অন্যান্য কৌশলগত বিকল্পও বিবেচনা করছে। এতে গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা অন্তর্ভুক্ত, যদিও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের পর থেকে, গ্রিনল্যান্ডে সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুমান বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দারা ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা অর্জনে আগ্রহী হলেও, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে যাওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। বিভিন্ন জনমত সমীক্ষা দেখায় যে অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ডীয় নাগরিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে চান এবং কোনো বিদেশি শক্তির অধীনে না যেতে চান।
ট্রাম্পের সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নেটো জোটের মধ্যে তীব্র মতবিরোধের সৃষ্টি করতে পারে। নেটোর সদস্য দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপে সমর্থন না করে, তবে জোটের অভ্যন্তরে ফাটল দেখা দিতে পারে।
ইউরোপের বেশ কয়েকটি প্রধান দেশ, বিশেষ করে ডেনমার্কের পার্শ্ববর্তী স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করছে।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের এই আর্থিক প্রস্তাবের বাস্তবায়ন বা না হওয়া নির্ভর করবে ডেনমার্কের কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং নেটোর অভ্যন্তরীণ আলোচনার ফলাফলের ওপর। যদি যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে গ্রিনল্যান্ডকে নিজের দখলে নিতে চায়, তবে ডেনমার্কের সামরিক সতর্কতা এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিক্রিয়া সম্ভাব্য সংঘাতের মাত্রা নির্ধারণ করবে।
এ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি, তবে হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ আলোচনার খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ দিকে ঘুরে গেছে। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়া এবং নেটোর অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এই বিষয়ের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।



