ফেনি জেলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের অপারেশন থিয়েটারে গ্যাস চুলায় রান্না চালিয়ে আসা নার্সদের অভিযোগ উঠে। অভিযোগ অনুসারে, প্রায় দুই বছর ধরে কিছু সিনিয়র স্টাফ নার্স থিয়েটারের কক্ষকে রান্নাঘর ও শয়নকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করছেন, যদিও একই জায়গায় সিজারিয়ান ডেলিভারির মাধ্যমে প্রসূতি মা ও নবজাতককে অপারেশন করা হয়।
অপারেশন থিয়েটারকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ সতর্কতার প্রয়োজন, তবে গ্যাস চুলা চালিয়ে খাবার প্রস্তুত করা এবং কক্ষকে বিশ্রামস্থল হিসেবে ব্যবহার করা রোগীর নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এমন পরিবেশে বায়ু দূষণ, তাপমাত্রা পরিবর্তন এবং ধোঁয়া সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যা প্রসূতি মা ও নবজাতকের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
এই অনিয়মের বিষয়ে রোগীর আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। এক স্বজন বলেন, “মধ্যবিত্ত পরিবার হিসেবে আমরা সরকারি হাসপাতালের সেবা নিতে বাধ্য, কিন্তু এ ধরনের অবহেলা আমাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; রোগীর স্বাস্থ্যের ঝুঁকি স্বীকার করা উচিত।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ প্রকাশের পর দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, একটি ত্রিস্তরীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ফলাফল জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিটির আয়োজনকারী হিসেবে জ্যেষ্ঠ কনসালটেন্ট ও সহকারী পরিচালক ডা. জালাল উদ্দিনকে নির্ধারিত করা হয়েছে।
কমিটির অন্যান্য সদস্য হিসেবে সার্জারি বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. আদনান আহমদ এবং সদস্য সচিব হিসেবে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শোয়েব ইমতিয়াজ নিলয় নিযুক্ত হয়েছেন। এই তিনজনের দায়িত্ব হল বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের মাধ্যমে স্পষ্ট প্রতিবেদন প্রস্তুত করা।
কমিটির সদস্য সচিব ডা. শোয়েব ইমতিয়াজ নিলয় জানান, “অপারেশন থিয়েটার একটি সংবেদনশীল এলাকা, যেখানে কোনো ধরনের রান্না করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। আমরা সকল প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করে রিপোর্টে উপস্থাপন করব এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “তদন্তের সময় আমরা স্টাফের কাজের পদ্ধতি, গ্যাস চুলার ব্যবহার, এবং থিয়েটারের পরিবেশগত শর্তাবলী বিশ্লেষণ করব।”
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সাইফুল ইসলামও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন, “অপারেশন থিয়েটার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মান বজায় রাখে; এখানে রান্না করা কোনোভাবেই অনুমোদিত নয়। তদন্তের ফলাফল পাওয়ার পর আমরা দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “রোগীর স্বাস্থ্য রক্ষা আমাদের প্রধান দায়িত্ব, এবং এ ধরনের লঙ্ঘন সহ্য করা যাবে না।”
তদন্ত কমিটি পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের লক্ষ্য রাখবে। প্রতিবেদনে প্রমাণিত লঙ্ঘনের পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট স্টাফের পরিচয়, এবং থিয়েটারের পরিবেশগত বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাসপাতাল প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অপারেশন থিয়েটারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন করবে।
এই ঘটনা সরকারি হাসপাতালের মানদণ্ড ও রোগীর নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী, অপারেশন থিয়েটারকে স্টেরাইল পরিবেশ বজায় রাখতে বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মী ও নির্দিষ্ট সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়; গ্যাস চুলা বা কোনো রান্নার সরঞ্জাম ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
অবশেষে, রোগী ও তাদের পরিবারকে এই ধরনের অনিয়মের প্রতি সতর্ক থাকতে এবং কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ হাসপাতাল প্রশাসনকে জানাতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত তদারকি বাড়িয়ে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হচ্ছে।



