বাংলাদেশের কর্পোরেট পরিবেশে সত্য প্রকাশের ফলে কর্মচারীর পেশাগত ও সামাজিক অবস্থার ওপর যে প্রভাব পড়ে, তা সাম্প্রতিক মিডিয়া উপস্থাপনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে। দুইটি টেলিভিশন ধারাবাহিক এবং একটি নেটফ্লিক্স চলচ্চিত্র একই ধরনের ঘটনা তুলে ধরেছে, যেখানে অভিযোগকারীকে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং অপরাধীকে প্রতিষ্ঠানের রক্ষায় রাখা হয়।
প্রথম ধারাবাহিকটি যৌন হয়রানির অভিযোগের পর একটি পরিষ্কার সমাপ্তি না দিয়ে, কর্মচারীকে একটি স্বচ্ছন্দ সমাপ্তি পত্র দিয়ে বরখাস্তের দিকে ধাবিত করে। দ্বিতীয় ধারাবাহিকটি ধর্ষণের অভিযোগকে আইনি ভাষা, ক্ষমতার সমীকরণ এবং সংস্থার আনুগত্যের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গোপন করে। উভয়ই দাবি করে যে গল্পগুলো বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরি।
নেটফ্লিক্সের “হাক” চলচ্চিত্রও একই রকমের সত্য কাহিনী উপস্থাপন করে, যেখানে অপরাধীকে আইনি ও সংস্থাগত কাঠামো রক্ষা করে এবং শিকারকে সমাজের সঙ্গে একাকী চুক্তিতে বাধ্য করে। এই তিনটি উদাহরণ একত্রে দেখায় যে, অভিযোগ উত্থাপনের পর শিকারীর ক্যারিয়ার, সামাজিক আমন্ত্রণ এবং মানসিক সমর্থন সবই হ্রাস পায়।
বাংলাদেশের কর্পোরেট সংস্কৃতিতে অভিযোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কলের উত্তর দেওয়া, মিটিং নির্ধারণ করা এবং চা পরিবেশন করা স্বাভাবিক। তবে সত্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই সহায়তা কেবল প্রতীকী হয়ে যায়, আর ক্যালেন্ডারগুলো পূর্ণ হয়ে যায় কিন্তু বাস্তবিক সাহায্য কমে যায়।
প্রতিষ্ঠানের সুনামকে শেয়ারের দামের মতোই গুরুত্ব দেওয়া হয়। একবার কোনো নামের সঙ্গে নেতিবাচক অভিযোগ যুক্ত হলে, সেই সুনাম দ্রুত হ্রাস পায় এবং ব্যবসার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। শেয়ারহোল্ডার, গ্রাহক ও অংশীদাররা এমন সংস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
অভিযোগের ফলে কর্মচারীর উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, টার্নওভার বাড়ে এবং নতুন প্রতিভা আকর্ষণে বাধা সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘায়ু ও সম্ভাব্য জরিমানা কোম্পানির আর্থিক ভারে অতিরিক্ত চাপ যোগায়। এই সবই সংস্থার মুনাফা ও বাজার অবস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিও এখন কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কঠোর নীতি প্রয়োগের দিকে ঝুঁকছে। শিকায়তাকারীর সুরক্ষা না দিলে, ভবিষ্যতে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল বা শেয়ার মূল্যের হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ে।
ব্র্যান্ডের প্রতি ভোক্তাদের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হলে, বিক্রয় হ্রাস এবং বাজার শেয়ার হারানোর সম্ভাবনা বাড়ে। অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোও এমন সংস্থার সঙ্গে ব্যবসা করা থেকে বিরত থাকতে পারে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটায়।
অবশ্যই, এই প্রবণতা পরিবর্তনের জন্য কিছু ইতিবাচক সংকেত দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ESG (Environmental, Social, Governance) মানদণ্ডের অনুসরণে, বড় কোম্পানিগুলো এখন কর্মচারীর অভিযোগ শোনার জন্য স্বতন্ত্র হটলাইন ও গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
তবে, যদি সংস্থা কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দেখিয়ে বাস্তবে শিকায়তাকারীর ওপর চাপ দেয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় সুনামগত ক্ষতি এবং আর্থিক ক্ষতির দিকে নিয়ে যাবে। কর্মচারীর বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে হলে, বাস্তবিক সুরক্ষা ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান প্রদান করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, কর্পোরেট পরিবেশে সত্য বলার খরচ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, বরং ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করে। সংস্থাগুলোকে স্বচ্ছ অভিযোগ প্রক্রিয়া, গোপনীয়তা রক্ষা এবং শিকায়তাকারীর পুনর্বাসনে সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে সুনাম, কর্মশক্তি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।



