ঢাকা, ৯ জানুয়ারি ২০২৬ – বাংলাদেশে উচ্চ সুদের চাপের কারণে স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বাধা সৃষ্টি হওয়ায়, সংসদ সদস্য খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা পণ্যের শুল্কে বিশ শতাংশের পরিবর্তে বিশ শতাংশ হ্রাসের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। প্রস্তাবটি দেশের বাণিজ্য নীতি পুনর্বিবেচনা এবং আমদানি খরচ কমিয়ে উৎপাদন খরচ হ্রাসের লক্ষ্যে করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের ঋণভার কমে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়বে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যের উপর প্রযোজ্য শুল্কের হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি, যা বেশিরভাগ উৎপাদন খাতের জন্য খরচের বড় অংশ গঠন করে। উচ্চ সুদের হার এবং ঋণ ব্যয়ের বাড়তি চাপের ফলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান নতুন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল ক্রয়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে এই খরচের কিছু অংশ কমে, ফলে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
প্রস্তাবটি সরকারী অর্থনৈতিক নীতি পরিষদের আলোচনায় আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো শুল্ক হ্রাসের প্রভাব বিশ্লেষণ করে, রাজস্ব ক্ষতি ও বাজারের প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করবে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে, শুল্ক হ্রাসের কার্যকরী তারিখ এবং প্রয়োগের পরিসর নির্ধারণের জন্য অতিরিক্ত বিধান প্রণয়ন করা হবে।
ব্যবসা সমিতি ও শিল্প সংস্থাগুলো প্রস্তাবের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তারা যুক্তি দেয়, শুল্ক হ্রাসের ফলে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির দাম কমে, উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম কমে যাবে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি ও কৃষি যন্ত্রপাতি খাতে এই পরিবর্তন সরাসরি প্রতিফলিত হবে। তবে কিছু সংস্থা সতর্কতা প্রকাশ করেছে, শুল্ক হ্রাসের ফলে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা হ্রাস পেতে পারে।
শুল্ক হ্রাসের ফলে আমদানি-নির্ভর শিল্পগুলো, যেমন গৃহস্থালী যন্ত্রপাতি ও মোবাইল ফোন, দ্রুত সস্তা পণ্য পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, স্থানীয় উৎপাদনকারীরা কম দামে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবে, যা তাদের পণ্যের গুণগত মান ও উৎপাদন পরিমাণ বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে শুল্ক হ্রাসের ফলে সরকারী আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বাজেট ঘাটতি বাড়াতে পারে।
উচ্চ সুদের হার এবং ঋণ ব্যয়ের চাপের সঙ্গে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাবকে যুক্ত করা হয়েছে, কারণ উভয়ই শিল্পের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বর্তমান ঋণ বাজারে সুদের হার ১৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা ঋণগ্রহীতাদের জন্য বড় বোঝা সৃষ্টি করেছে। শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমে, ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা বাড়বে এবং শিল্পের আর্থিক অবস্থা স্থিতিশীল হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় শুল্ক হ্রাসের ফলে রাজস্বের সম্ভাব্য হ্রাসের হিসাব নিয়ে কাজ করছে। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, শুল্ক হ্রাসের ফলে সরকারের আয় প্রায় ১.৫ বিলিয়ন টাকার কমে যেতে পারে। তবে এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে বাড়তি রপ্তানি ও শিল্প উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাজারে শুল্ক হ্রাসের পাশাপাশি অন্যান্য নীতি পরিবর্তনের কথাও উঠে এসেছে, যেমন গ্যাসের দাম সরকারী দরে নির্ধারণের পরিকল্পনা এবং সবুজ শিল্পকে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ ভর্তুকি। এসব নীতি একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে, দেশের মোট বাণিজ্যিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে, খলিলুর রহমানের প্রস্তাবের সঙ্গে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের উল্লেখ রয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়। যদিও সরাসরি শুল্ক হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত নয়, তবে এই যোগাযোগের মাধ্যমে পারস্পরিক বাণিজ্য বাধা কমিয়ে আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে।
প্রস্তাবের বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে। প্রথমত, শুল্ক হ্রাসের ফলে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বাজার শেয়ার হ্রাস পেতে পারে, যা বেকারত্বের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারী আয়ের হ্রাসের ফলে সামাজিক সেবা ও অবকাঠামো প্রকল্পে প্রভাব পড়তে পারে। তাই নীতি নির্ধারকদের শুল্ক হ্রাসের সঙ্গে সমন্বিতভাবে শিল্প সহায়তা ও আয় পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে ২০ শতাংশ হ্রাসের প্রস্তাব স্থানীয় শিল্পের আর্থিক চাপ কমিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রাখে। তবে রাজস্বের সম্ভাব্য ক্ষতি এবং দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতার ওপর প্রভাব বিবেচনা করে সমন্বিত নীতি গঠন করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে শুল্ক হ্রাসের বাস্তবায়ন এবং তার ফলাফল দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।



