বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে ঋণ সুদের সর্বোচ্চ সীমা ৯% বাতিলের পর, ঋণ ও আমানত সুদের পার্থক্য দ্রুত বাড়তে থাকে। এখন ঋণ সুদের হার প্রায় আমানত হারের দ্বিগুণে পৌঁছেছে, কিছু ক্ষেত্রে এই পার্থক্য ৮ থেকে ১০ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত।
উচ্চ সুদের ব্যয় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলার হারও হ্রাস পেয়েছে, যা মোট অর্থনৈতিক গতি ধীর হওয়ার লক্ষণ বহন করে।
অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করছেন, যদিও ২০২৪ সালের নির্দেশে সুদের হার সম্পূর্ণভাবে বাজারভিত্তিক করা হয়েছে, তবু ব্যাংকিং সেক্টরে প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছা স্প্রেডকে অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ স্তরে ধরে রেখেছে। ফলে উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ডেইলি সান জানান, আমানত সুদের হার কমলেও ঋণ সুদের হার সমানুপাতিকভাবে কমে না, এটাই বাজারের অদক্ষতার মূল সূচক। উচ্চ স্প্রেড বিনিয়োগের আকর্ষণ হ্রাস করে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা তৈরি করে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। শিল্প ও ব্যবসায়িক ঋণ দেওয়ার বদলে তারা ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে সহজ মুনাফা অর্জন করতে পছন্দ করে। এই প্রবণতা বাস্তব অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহকে সংকুচিত করে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ড. সান সতর্ক করেন, যদি নন‑পারফরমিং লোন (খারাপ ঋণ) হ্রাস না পায়, তবে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি শোষণ করতে ঋণ সুদের হার আরও বাড়াতে পারে। ফলে ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে, যা সামগ্রিক চাহিদা হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাজারভিত্তিক সুদের হার মানে তদারকি ছাড়া কাজ করা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে স্প্রেড যদি ৬‑৭% এর উপরে থাকে, তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ধরনের চাপ কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনের ওপরও প্রভাব ফেলবে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যাংকারদের একটি বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈঠকে উল্লেখ করা হয় যে, ২০২৪ সালের নির্দেশনা সত্ত্বেও কিছু ব্যাংক অতিরিক্ত স্প্রেড বাড়িয়ে ঋণকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে, যার ফলে ব্যবসা ও শিল্পের কার্যক্রমে ক্ষতি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক জানান, বাজারভিত্তিক সুদের হার প্রয়োগের পরেও স্প্রেডের অপ্রয়োজনীয় বৃদ্ধি ঋণগ্রহীতাদের জন্য অতিরিক্ত খরচের সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে স্প্রেডের প্রবণতা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। যদি স্প্রেড উচ্চ মাত্রায় স্থায়ী হয়, তবে ঋণগ্রহীতা, বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মালিকদের আর্থিক চাপ বাড়বে, যা উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলো যদি ঝুঁকি গ্রহণের মনোভাব পরিবর্তন করে, ঋণ সুদের হার কমিয়ে দেয়, তবে বিনিয়োগের উত্সাহ বাড়বে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক গতি ত্বরান্বিত হবে।
সারসংক্ষেপে, ঋণ সুদের স্প্রেডের অপ্রয়োজনীয় বৃদ্ধি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। নিয়ন্ত্রক নীতি ও ব্যাংকিং সেক্টরের ঝুঁকি গ্রহণের মনোভাবের সমন্বয়ই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মূল চাবিকাঠি হবে।



