ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর ড্রোন দ্বারা দক্ষিণ গাজা অঞ্চলে গৃহহীনদের আশ্রয়স্থলকে লক্ষ্য করে করা আক্রমণে তিনজন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। ঘটনাটি বৃহস্পতিবার বিকালে ঘটেছে এবং গাজার জরুরি সেবা বিভাগ এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
গাজা সিভিল ডিফেন্স ও ইমার্জেন্সি ডিরেক্টরেটের সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় অবস্থিত একটি তামিল শিবিরে ড্রোনের গুলি আঘাত হানা। শিবিরটি বাস্তুচ্যুত পরিবারদের সাময়িক আশ্রয়স্থল ছিল এবং আক্রমণের ফলে শিবিরের মধ্যে থাকা তিনজন নাগরিক তৎক্ষণাৎ নিহত হয়।
আল-মাওয়াসি অঞ্চলকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ‘নিরাপদ অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণার পরেও নিয়মিত আকাশীয় আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা যায়। এই ঘোষণার পরেও শিবিরের আশেপাশে ধারাবাহিকভাবে গুলিবর্ষণ ঘটছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই দিনে গাজা উপত্যকার উত্তর অংশে আরেকটি আক্রমণ ঘটেছে, যেখানে ইসরায়েলি গুলির ফলে এক ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা সূত্রের মতে, শিশুটি গুলির প্রভাবে তৎক্ষণাৎ মারা যায়। এই ঘটনা গাজার বিভিন্ন স্থানে চলমান সহিংসতার ধারাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
অক্টোবর ২০২৩ থেকে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে গাজা অঞ্চলে মোট ৭১,৪০০ের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যার অধিকাংশই নারী ও শিশু। পাশাপাশি ১,৭১,০০০ের বেশি মানুষ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এই সংখ্যাগুলি গাজার জনসংখ্যার উপর গভীর প্রভাব ফেলছে এবং মানবিক সংকটকে তীব্রতর করছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি আক্রমণে অতিরিক্ত ৪২৪ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,১৮৯ জন আহত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায় যে, চুক্তি সত্ত্বেও সংঘর্ষের তীব্রতা অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই আক্রমণকে ব্যাপকভাবে নিন্দা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বেশ কিছু মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গাজায় মানবিক সহায়তা প্রদান এবং যুদ্ধবিরতি রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইসরায়েলি সরকার গাজার নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার জন্য এই আক্রমণকে ন্যায়সঙ্গত বলে দাবি করে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপে রূপান্তর এবং নিয়মিত আকাশীয় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে গৃহযুদ্ধের বৈশিষ্ট্য বহন করে। তারা সতর্ক করেন যে, দীর্ঘমেয়াদী মানবিক সংকট গাজার সামাজিক কাঠামোকে ক্ষয় করে এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘর্ষের বর্তমান পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা ভূমিকা সীমিত বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতিমালা গাজা অঞ্চলে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক চ্যানেলকে শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন গাজা অঞ্চলে মানবিক সাহায্যের প্রবাহ বাড়াতে আর্থিক সহায়তা এবং জরুরি চিকিৎসা সরবরাহের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় দেশগুলো ইসরায়েলি সরকারকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মানদণ্ড মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছে।
আঞ্চলিকভাবে, গাজা উপত্যকার অবস্থা পূর্বের সংঘর্ষের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে ২০০৮-২০০৯ সালের গাজা যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের ধ্বংস এবং মানবিক সংকট দেখা গিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজার জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোর অবনতি নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে।
ভবিষ্যৎ মাইলস্টোনের দিক থেকে, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবিক সংস্থাগুলো গাজায় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানোর জন্য নিরাপদ করিডোর স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চালু রয়েছে, যেখানে যুদ্ধবিরতি রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের আহ্বান করা হচ্ছে।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মানবিক নীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবিক সহায়তা দ্রুত পৌঁছানোই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান অগ্রাধিকার।



