কিশোরগঞ্জের হারুয়া এলাকায়, নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত পাগলা মসজিদ স্থানীয় জনগণের জন্য দান ও শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। মসজিদটি দীর্ঘদিনের লোককথা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এবং এখনো বহু মানুষ এখানে দান করতে আসেন। এই দানের মাধ্যমে মসজিদটি সামাজিক ও শিক্ষামূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
মসজিদে দানের ধরন বহুমুখী; নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণের অলংকার, গবাদি পশু, হাঁস‑মুরগি ইত্যাদি সামগ্রীও দান করা হয়। দাতারা প্রায়ই নিজের সম্পদকে ধর্মীয় সেবার সঙ্গে যুক্ত করে এখানে অবদান রাখেন। দানের পরিমাণের ওপর নির্ভর না করে, প্রত্যেকের ছোটো‑বড়ো অবদানই মসজিদের কার্যক্রমকে সমর্থন করে।
মসজিদের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে কোনো লিখিত রেকর্ড না থাকলেও, স্থানীয় লোককথা অনুসারে একদিন নরসুন্দা নদীর প্রবল স্রোতে এক আধ্যাত্মিক সাধক মাদুরে বসে ভাসতে দেখা যায়। কয়েক দিনের মধ্যে তার আশপাশে ভক্তদের সঙ্কলন হয় এবং শিষ্যরা তার জন্য একটি হুজরাখানা নির্মাণ করে। সাধকের মৃত্যুর পর হুজরাখানার পাশে তার সমাধি করা হয়, এবং পরবর্তীতে সেই স্থানে মসজিদ গড়ে ওঠে, যা পরে ‘পাগলা মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।
অন্য একটি লোককথা বলে, হযরতনগরের প্রতিষ্ঠাতা হযরত খানের তৃতীয় পুরুষ জোলকরণ খানের বিবি, যাকে ‘পাগলা বিবি’ বলা হতো, নিঃসন্তান ছিলেন। স্বপ্নে দেখা মসজিদ নির্মাণের ইচ্ছা তাকে নরসুন্দা নদীর তীরে এই মসজিদ গড়তে উদ্বুদ্ধ করে। তার নামেই মসজিদটি ‘পাগলা মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যদিও এই গল্পগুলো যাচাইযোগ্য রেকর্ডে নেই, তবে স্থানীয় মানুষের মধ্যে এদের প্রভাব শক্তিশালী।
মসজিদ কমপ্লেক্সের পরিবেশে বিভিন্ন প্রকার গাছের ছায়া এবং ১০৪টি রঙিন বাতি সাজানো রয়েছে, যা সন্ধ্যায় আলোকিত হয়ে এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে। মসজিদের সংলগ্ন নূরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসায় বর্তমানে ১৩০ জন এতিম শিশুর শিক্ষা চলছে। এই শিশুরা খাবার, বাসস্থান এবং শিক্ষার সব খরচ মসজিদের আয় থেকে বহন করা হয়, যা তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করে।
মসজিদ পরিচালনায় মোট ৩৪ জন কর্মী নিয়োজিত আছেন, যারা দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষাসেবা এবং দান সংগ্রহের কাজ করেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১০ জন সশস্ত্র গার্ড পালাক্রমে মসজিদের প্রাঙ্গণ পর্যবেক্ষণ করেন, যা দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখে।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে একটি ইসলামিক কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে দশ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই ভবনে একসঙ্গে প্রায় ৫০,০০০ মুসলমানের নামাজের ব্যবস্থা হবে, এবং আলাদাভাবে পাঁচ হাজার নারী মুসলমানের জন্য পৃথক স্থান থাকবে। বৃহৎ ক্ষমতার এই পরিকল্পনা স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষা দৃষ্টিকোণ থেকে, মসজিদ ও মাদ্রাসার সমন্বয় স্থানীয় শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কোরআন হাফিজ করা ছাড়াও মৌলিক গণিত, বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা পায়, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সহায়তা করে। মসজিদের আয় থেকে সরাসরি শিক্ষার খরচ মেটানো হয়, ফলে আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা পরিবারগুলোও তাদের সন্তানকে শিক্ষা দিতে পারে।
আপনার আশেপাশে যদি এমন কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান থাকে, যেখানে দান ও শিক্ষার সমন্বয় ঘটছে, তবে তার সমর্থনে অংশগ্রহণ করা একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। দান করার আগে আপনি কি জানেন, আপনার ছোটো অবদান কীভাবে একটি শিশুর শিক্ষার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে?



