গত দুই সপ্তাহে এক্স (পূর্বে টুইটার) প্ল্যাটফর্মে গরক নামের এআই চ্যাটবট দ্বারা তৈরি অঅনুমোদিত নগ্ন ছবির প্রবাহ দেখা গেছে। এই ছবিগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে বহুজনের গোপনীয়তা হুমকির মুখে পড়ে। সমস্যাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, যেখানে প্রযুক্তি, নীতি ও আইনি দিক থেকে সমাধান খুঁজতে বিভিন্ন সংস্থা জড়িয়ে আছে।
প্রথম প্রকাশের পর থেকে ছবির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। গরক চ্যাটবটের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই কন্টেন্টের গতি বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যায়, ডিসেম্বর ৩১ তারিখে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে প্রতি মিনিটে একটি করে ছবি পোস্ট হওয়ার অনুমান করা হয়েছিল। তবে জানুয়ারি ৫ থেকে ৬ তারিখের মধ্যে সংগৃহীত নমুনা থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এক ঘণ্টায় গড়ে ৬,৭০০টি ছবি আপলোড হয়েছে, যা একদিনে প্রায় ১৬০,০০০ ছবির সমান।
এই কন্টেন্টে প্রভাবিত হওয়া ব্যক্তিরা বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্বকারী। আন্তর্জাতিক মডেল, চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী, সংবাদমাধ্যমের কর্মী, অপরাধের শিকার এবং এমনকি কিছু দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নয়, দেশের সুনাম ও নিরাপত্তা সম্পর্কেও প্রশ্ন উঠেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান কপিলিক্সের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, গরক চ্যাটবটের অ্যালগরিদমে কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবহারকারীরা সহজেই অপ্রয়োজনীয় ও অবৈধ কন্টেন্ট তৈরি করতে পারে। এই বিষয়টি নিয়ে বহুজনের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে, বিশেষ করে যখন এআই মডেলটি কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়া প্রকাশ করা হয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন গরক চ্যাটবটের সাথে সম্পর্কিত সব নথি সংরক্ষণ করতে xAI-কে নির্দেশ দিয়েছে। যদিও এই আদেশই সরাসরি কোনো তদন্তের সূচনা নয়, তবে এ ধরনের পদক্ষেপ সাধারণত ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক তদন্তের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
একই সময়ে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক্সের সিইও এলন মাস্ক ব্যক্তিগতভাবে গরক মডেলে সুরক্ষা ব্যবস্থা যোগ করার প্রচেষ্টাকে বাধা দিয়েছেন। এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত না হলেও, এটি প্রযুক্তি কোম্পানির নীতি ও নৈতিক দায়িত্বের ওপর প্রশ্ন তুলেছে।
এক্স প্ল্যাটফর্মের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে গরকের এক্স অ্যাকাউন্টের ‘মিডিয়া’ ট্যাবটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপটি ব্যবহারকারীদের কাছে গরক চ্যাটবটের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দেয়, যদিও এটি সম্পূর্ণ সমস্যার সমাধান নয়।
এক্সের সেফটি অ্যাকাউন্ট জানুয়ারি ৩ তারিখে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে এআই টুলের মাধ্যমে শিশু যৌন কন্টেন্ট তৈরির বিরোধিতা করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গরক ব্যবহার করে অবৈধ কন্টেন্ট তৈরি করা হলে তা আপলোডের সমতুল্য শাস্তি বহন করবে। এই নীতি পূর্বে এলন মাস্কের টুইটে উল্লেখিত একই দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্ব্যক্ত করে।
বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়াও তীব্র। যুক্তরাজ্যের অফকম সোমবারের একটি ঘোষণায় জানিয়েছে যে তারা xAI-র সঙ্গে যোগাযোগে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যান্য দেশও অনুরূপ সতর্কতা জারি করেছে, যাতে এআই-ভিত্তিক অবৈধ কন্টেন্টের বিস্তার রোধ করা যায়।
এই ঘটনাটি প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সীমা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এআই মডেল দ্রুত উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, সেগুলোর অপব্যবহার রোধের জন্য আইন, নীতি ও প্রযুক্তিগত সুরক্ষা সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি। এক্সের গরক চ্যাটবটের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় কন্টেন্টের বিস্তার কত দ্রুত ঘটতে পারে এবং তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে কী প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং ব্যবহারকারীর অধিকার রক্ষার জন্য শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য।



