আলেপ্পোর উত্তর‑পশ্চিমাঞ্চলে সিরিয়ান সরকারী সেনাবাহিনী ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) বৃহস্পতিবার নতুন আক্রমণ চালায়। উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই তৃতীয় দিন অতিক্রম করেছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সংঘর্ষের তীব্রতা ও বেসামরিক জনগণের ওপর প্রভাবকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে।
সিরিয়ান সেনাবাহিনী পূর্বে কুর্দি বসতিপ্রধান এলাকায় আক্রমণ চালানোর অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় এই নতুন অভিযান শুরু করেছে। এসডিএফের দাবি অনুযায়ী, সিরিয়ান বাহিনীর ক্রমবর্ধমান হুমকি তাদেরকে প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। উভয় দিকের সামরিক কার্যক্রমে গুলি চালনা, বোমা বিস্ফোরণ এবং গৃহবাহিরে গুলিবর্ষণ অন্তর্ভুক্ত।
সিরিয়ান সেনাবাহিনী সাতটি মানচিত্র প্রকাশ করে যেখানে নির্দিষ্ট এলাকায় আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত হওয়ার নির্দেশ দেয়। স্থানীয় সময় বিকাল ৩টায় শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়া এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়, যা নাগরিক চলাচলকে সীমিত করে।
মঙ্গলবার থেকে চলমান সংঘর্ষের ফলে হাজারো পরিবার তাদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩,৫০০ জন মানুষ এই এলাকায় থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ স্থানান্তরিত ব্যক্তিরা নারী, শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, যাদের মধ্যে কিছু রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, আবার কিছুকে অ্যাম্বুলেন্সে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।
আলেপ্পোর সিরিয়ান বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফয়সাল আলি উল্লেখ করেন, “আমরা এখন পর্যন্ত যে মানুষদের দেখেছি, তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু, এবং কিছু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি।” তিনি আরও বলেন, “বেসামরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।” এই মন্তব্যগুলো স্থানীয় জনগণের উদ্বেগকে তুলে ধরে।
এসডিএফের মতে, তাদের যোদ্ধারা আলেপ্পোর সিরিয়াক অঞ্চলে দামেস্কের সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। তারা দাবি করে যে প্রতিপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং তাদের নিজস্ব ক্ষতি সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই দাবিগুলো উভয় পক্ষের মধ্যে তথ্যের পার্থক্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি এই আক্রমণকে গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “কুর্দি বসতিপ্রধান এলাকায় বেসামরিকদের ওপর আক্রমণ এবং জনতাত্ত্বিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রচেষ্টা জাতিগত নির্মূলের ঝুঁকি তৈরি করে।” বারজানি সকল পক্ষকে সংযম বজায় রাখতে, বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে আহ্বান জানান।
দামেস্কের সরকারী মুখপাত্র একই সময়ে সিরিয়ান সেনাবাহিনীর পদক্ষেপকে বৈধ রক্ষা করে এবং এসডিএফের অভিযোগকে অস্বীকার করে। তিনি বলেন, “সিরিয়ান সশস্ত্র বাহিনী আন্তর্জাতিক সীমানা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কাজ করছে।” এই বিবৃতি কুর্দি গোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, বেসামরিক এলাকায় অপ্রয়োজনীয় হামলা ও জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি যুদ্ধাপরাধের শর্ত পূরণ করতে পারে। তারা সতর্ক করেন যে, যদি উভয় পক্ষের কার্যক্রম মানবিক নীতিমালার লঙ্ঘন হিসেবে প্রমাণিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক আদালতে দায়বদ্ধতা আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করছেন। তারা অনুমান করছেন যে, যদি সংঘর্ষের তীব্রতা অব্যাহত থাকে, তবে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষাকারী মিশন বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে, সিরিয়া ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমঝোতা গড়ে তোলার চাহিদা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।



