পৃথিবী ক্রমাগত ন্যুট্রিনো নামে অতি হালকা কণার প্রবাহে নিমজ্জিত, যা গ্যালাক্সির সব নক্ষত্রের পারমাণবিক বিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন হয়। এই কণাগুলো কোনো চার্জ বহন করে না, ভর অতি ক্ষুদ্র এবং পদার্থের সঙ্গে খুবই কমই মিথস্ক্রিয়া করে, ফলে তারা পৃথিবীর বায়ু, মাটি ও সমুদ্রের মধ্য দিয়ে অক্ষতভাবে অতিক্রম করে।
গ্যালাক্সি জুড়ে ন্যুট্রিনোর মোট প্রবাহের পরিমাণ সাম্প্রতিক গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে প্রায় একশো ট্রিলিয়ন (১০^১৪) কণা প্রতি সেকেন্ডে। সূর্য থেকে আসা ন্যুট্রিনো এই মোটের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি অংশ গঠন করে, বাকি অংশ গ্যালাক্সির অন্যান্য নক্ষত্র থেকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পৃথিবী যে ন্যুট্রিনো পায় তা দিকনিরপেক্ষ, অর্থাৎ সব দিক থেকে সমান পরিমাণে আসে।
এই সংখ্যা নির্ণয়ের পদ্ধতি মূলত গ্যালাক্সির নক্ষত্র জনসংখ্যা, তাদের গড় বয়স ও ভর, এবং পারমাণবিক ফিউশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন ন্যুট্রিনোর হারকে একত্রে গণনা করা। গবেষকরা নক্ষত্রের বিকাশের তত্ত্ব ও পর্যবেক্ষণমূলক ডেটা ব্যবহার করে গ্যালাক্সির মোট ন্যুট্রিনো উৎপাদন অনুমান করেন এবং তা পৃথিবীর দিকে পৌঁছানোর পরিমাণে রূপান্তর করেন।
ন্যুট্রিনোর শক্তি স্তর বেশিরভাগই কয়েক মেগা ইলেকট্রনভোল্ট (MeV) পরিসরে থাকে, যা সূর্যের ন্যুট্রিনোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। যদিও এদের শক্তি তুলনামূলকভাবে কম, তবু বিশাল সংখ্যায় উপস্থিতি গ্যালাক্সি-ব্যাপী ন্যুট্রিনো পটভূমি গঠন করে।
এই অদৃশ্য কণাগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন, তবে সুপার-কায়োকেন ও আইসকিউবের মতো বিশাল সনাক্তকরণ যন্ত্রে বিরল মিথস্ক্রিয়া রেকর্ড করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, পানির ট্যাঙ্কে থাকা বিশাল ডিটেক্টরগুলোতে ন্যুট্রিনো যখন পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ করে, তখন সৃষ্ট আলোকস্ফটিকের ঝলক রেকর্ড করা হয়। এ ধরনের ঘটনা গ্যালাক্সি-ব্যাপী ন্যুট্রিনো প্রবাহের অস্তিত্বকে নিশ্চিত করে।
গ্যালাক্সি ন্যুট্রিনো গবেষণার গুরুত্ব বহুমুখী। প্রথমত, ন্যুট্রিনো নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সরাসরি জানার একমাত্র উপায়, কারণ তারা গলিত কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে কোনো বাধা ছাড়াই মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, গ্যালাক্সির গঠন ও তার ভৌত বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে ন্যুট্রিনো একটি স্বতন্ত্র সূচক হিসেবে কাজ করে। তৃতীয়ত, মৌলিক কণার পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষায় এই কণাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য বা জলবায়ুর ওপর ন্যুট্রিনোর কোনো সরাসরি প্রভাব পাওয়া যায়নি। তাদের মিথস্ক্রিয়া হার এতই কম যে, মানবদেহের কোষে এক বছরে একবারেরও কমই ন্যুট্রিনো ধরা পড়ে। তাই এই বিশাল প্রবাহ সত্ত্বেও তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি করে না।
ভবিষ্যতে আরও সংবেদনশীল ডিটেক্টর ও বৃহত্তর পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যা গ্যালাক্সি-ব্যাপী ন্যুট্রিনো পটভূমির সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলো মাপতে সক্ষম হবে। এমন ডেটা গ্যালাক্সির নক্ষত্র গঠন, তারার বিবর্তন এবং মহাবিশ্বের মৌলিক শারীরিক নিয়ম সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, আমাদের গ্রহের চারপাশে ন্যুট্রিনোর প্রবাহ গ্যালাক্সির সব নক্ষত্রের সম্মিলিত ফল, যা অদৃশ্য হলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অমূল্য সম্পদ। এই অদ্ভুত কণাগুলো কীভাবে গ্যালাক্সির গোপনীয়তা উন্মোচন করে, তা জানার জন্য বিজ্ঞানীরা ধারাবাহিকভাবে নতুন পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি উন্নয়ন করছেন।
পাঠকরা যদি এই বিষয়ে আরও জানার আগ্রহ রাখেন, তবে ন্যুট্রিনো গবেষণার সর্বশেষ অগ্রগতি অনুসরণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পের ফলাফল সম্পর্কে আপডেট থাকা উপকারী হবে। আপনার মতামত বা প্রশ্ন থাকলে শেয়ার করুন, যাতে বিজ্ঞান ও সমাজের সংযোগ আরও দৃঢ় হয়।



