ইরানে বৃহৎ প্রতিবাদ চলাকালীন দেশব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগে বিশাল ব্যাঘাত ঘটেছে। বৃহস্পতিবার, অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রার তীব্র পতনের ফলে সৃষ্ট জনঅশান্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেটওয়ার্ক ট্র্যাফিকের পরিমাণ হঠাৎ কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ সংস্থা একসাথে একই সময়ে সংযোগের হ্রাস রেকর্ড করেছে। এই সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের পতন ঠিক দুপুরের কাছাকাছি শুরু হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের সময় ১১:৩০ টা এবং তেহরানের স্থানীয় সময় ২০:০০ টার সমান।
মিয়ান গ্রুপের একজন সাইবারসিকিউরিটি গবেষক, যিনি ইরানের নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন, জানান, দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, এই বিচ্ছিন্নতা সরকারী হস্তক্ষেপের ফলাফল হতে পারে।
কেন্টিকের ইন্টারনেট বিশ্লেষণ পরিচালকও একই সময়ে ঘটমান ব্যাঘাতের ব্যাপকতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ইরানের নেটওয়ার্কে প্রায় সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট দেখা গেছে, যা দেশের তথ্যপ্রবাহকে কার্যত থামিয়ে দিয়েছে।
নেটব্লকস, ক্লাউডফ্লেয়ার এবং আইওডিএ—all এই তিনটি সংস্থা একই মুহূর্তে ইরানের সংযোগে হঠাৎ পতন রেকর্ড করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের বেশিরভাগ আইএসপি ও ডেটা সেন্টার থেকে ট্র্যাফিকের প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।
ক্লাউডফ্লেয়ারের ডেটা ইনসাইটস প্রধানের মতে, যদিও কিছু সীমিত ট্র্যাফিক এখনও চলমান, তবু দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা কার্যত অফলাইন অবস্থায় আছেন। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমে গুরুতর প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।
প্রতিবাদগুলো ডিসেম্বরের শেষের দিকে তীব্রতর হয়, যখন ইরানের মুদ্রার মান হঠাৎ করে হ্রাস পায়। মুদ্রা পতনের ফলে বাজারে পণ্যের ঘাটতি, দামবৃদ্ধি এবং মৌলিক সামগ্রীর অভাব দেখা দেয়। এই আর্থিক সংকটই জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তেহরানের ঐতিহ্যবাহী বাজারে কিছু দোকান একাদশ দিন বন্ধ থাকার খবর নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। এই দীর্ঘ সময়ের বন্ধের ফলে স্থানীয় ব্যবসায়িক চক্রে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব পড়েছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া তীব্র ও সহিংস হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিবাদকারীদের ওপর কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের সরকার ইন্টারনেট সংযোগের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, এবং বর্তমান ব্ল্যাকআউটের পেছনে সরকারের হস্তক্ষেপের সন্দেহ রয়েছে। গবেষকরা উল্লেখ করেন, সরকারী নির্দেশনা ছাড়া এমন ব্যাপক সংযোগ বিচ্ছিন্নতা সম্ভব নয়।
ইরানের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত প্রতিনিধিত্বকারী দপ্তর থেকে এই বিষয়ের ওপর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটও প্রকাশের সময় অপ্রাপ্য ছিল, যা তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে ইন্টারনেট পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়নকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। যদি সংযোগ পুনরায় স্থাপিত না হয়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে আরও বড় বাধা সৃষ্টি হতে পারে, যা রাজনৈতিক আলোচনার দিকনির্দেশনা পরিবর্তন করতে পারে।



