ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার একটি নীতি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকারের বিষয়গুলো আলোচিত হয়। ইভেন্টটি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজন করে, এবং এতে রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। সংলাপের মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার ও নীতি বাস্তবায়নে সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি কতটা নিশ্চিত করা যায় তা নির্ণয় করা।
সংলাপের শিরোনাম ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার’ ছিল, যা ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভয়মুক্ত ভোটদান এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে। অংশগ্রহণকারীরা একমত যে, গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ কেবল ভোটের মাধ্যমে নয়, বরং নির্বাচনের পূর্ব ও পরবর্তী রাজনৈতিক আচরণ, নীতি বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দলগুলোর ইশতেহারকে বাস্তবায়নযোগ্য অঙ্গীকারে রূপান্তর করা জরুরি বলে জোর দেওয়া হয়।
সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার উল্লেখ করেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তি হল নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করা। তিনি বলেন, ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভয়মুক্ত ভোটদান এবং স্বচ্ছ ভোটপ্রক্রিয়া ছাড়া গণতন্ত্রের সত্যিকারের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়। মজুমদার আরও উল্লেখ করেন, যদিও ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত না হলেও তা জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের একটি চুক্তি হিসেবে কাজ করে, এবং এই চুক্তির অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে।
মজুমদার জোর দেন, নির্বাচন অবশ্যই আইনানুগ, অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হবে; কারসাজিমুক্ত নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি রক্ষা করা যায় না। তিনি উল্লেখ করেন, ভোটার তালিকায় সকল নাগরিকের অন্তর্ভুক্তি, ভোটদান প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ফলাফলের স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করা হলেই অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের লক্ষ্য পূরণ হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নির্দিষ্ট অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং তদারকি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জুলাই সনদ (July Certificate) সময়োপযোগী ও বাস্তবধর্মী সংস্কারের ইঙ্গিত দেয়। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের সকল নাগরিকই সমান অধিকারভোগী, এবং কোনো সীমিত পরিচয়ে কাউকে আবদ্ধ করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। জুবায়ের জানান, জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, এবং অযৌক্তিক প্রতিশ্রুতি থেকে বিরত থাকা হয়েছে।
জুবায়ের আরও বলেন, ইশতেহারে উল্লেখিত নীতিগুলো বাস্তবিকভাবে কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা স্পষ্ট করা হয়েছে, যাতে নির্বাচনের পরেও ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। তিনি উল্লেখ করেন, সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকার রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ, যেমন নিরাপদ ভোটকেন্দ্র, নারী পর্যবেক্ষক এবং আইনগত সুরক্ষা ব্যবস্থা, ইতিমধ্যে পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। এসব ব্যবস্থা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
বিএনপি নেতা ও আইনজীবী শাহাব উদ্দিন খান সংখ্যালঘুদের অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে ‘অর্থনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু’ ধারণা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পোশাক-আশার মতো সামাজিক চিহ্নের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের সুবিধা প্রদান করা উচিত, যাতে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়। খান আরও উল্লেখ করেন, সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ নীতি তৈরি করা হলে তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে।
খান যুক্তি দেন, সংখ্যালঘুদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ঋণসুবিধা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যা নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের নীতি বাস্তবায়ন না হলে সংখ্যালঘুদের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার কেবল কথার স্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে।
সংলাপের শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা সম্মত হন যে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে সকল রাজনৈতিক দলের জন্য ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা অপরিহার্য। তারা জোর দেন, ইশতেহারের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা, তদারকি প্রক্রিয়া এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। এই প্রক্রিয়া নির্বাচন পরবর্তী নীতি বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দেন, সংলাপে উত্থাপিত বিষয়গুলো যদি নির্বাচনী প্রচার ও ইশতেহারে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে পরবর্তী নির্বাচনে সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ভোটদানের হার বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারকে বাস্তবায়নযোগ্য অঙ্গীকারে রূপান্তর না করলে জনমত ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সমালোচনা বৃদ্ধি পাবে। সংলাপের ফলাফলকে ভিত্তি করে সরকার ও দলগুলোকে নির্বাচনের পরেও নীতি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় চালিয়ে যেতে হবে, যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের লক্ষ্য পূরণ হয়।



