ঢাকা শহরের রেস্টুরেন্টগুলো বর্তমানে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (LPG) সংকটের মুখোমুখি, যেখানে গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং সরবরাহ সীমিত হচ্ছে। সরকারী রেকর্ডে আমদানি ও মজুদ যথেষ্ট দেখানো সত্ত্বেও, কিছু পাইকারি বিক্রেতা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘাটতি তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) জানিয়েছে যে জানুয়ারি মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য টাকার ১,৩০৬ নির্ধারিত হয়েছে। তবে ঢাকার ও চট্টগ্রামের বাজারে একই সিলিন্ডার টাকার ১,৬৫০ থেকে ২,২০০ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা সরকারী মূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর তথ্য অনুসারে সাম্প্রতিক সময়ে LPG আমদানি বা মজুদের কোনো বড় ব্যাঘাত ঘটেনি। তবুও পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা সরকারী নির্ধারিত দামের উপরে টাকার ৩৫০ থেকে ৯০০ পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য ধার্য করে বিক্রি করছেন। এই অতিরিক্ত মূল্যের ফলে রেস্টুরেন্টের অপারেশন খরচ বাড়ছে।
ঢাকার রেস্টুরেন্টগুলো জানাচ্ছে যে তারা দৈনিক প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র ৩০-৪০ শতাংশই পেতে পারছে। ফলে রন্ধনশালার কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত মূল্যে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ব্যবসার ধারাবাহিকতা ও মুনাফার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
মিরপুর‑১ এর স্কাই লাউঞ্জের ব্যবস্থাপক সহকারী সাঈদ বিন সিরাজ জানান, তাদের রেস্টুরেন্টে সাধারণত দিনে প্রায় দশটি ১২ কেজি সিলিন্ডার প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমানে মাত্র দুই‑তিনটি সিলিন্ডারই সরবরাহ পাচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারী মূল্যের তুলনায় গ্যাসের দাম প্রায় টাকার ৪০০ বেশি। “অপারেশন চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা এই অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছি,” তিনি বলেন।
সিরাজের মতে, গ্যাসের সরবরাহের এই সংকটের ফলে রেস্টুরেন্টে শুধুমাত্র চারটি সিলিন্ডার বাকি রয়েছে, যা হয়তো এক বা দুই দিনের জন্যই টিকবে। গ্যাসের ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রন্ধনশালার কাজ সম্পূর্ণ থেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাজারে গ্যাসের দাম বাড়লেও, রেস্টুরেন্টগুলো এখনো খাবারের দাম বাড়াতে পারছে না। মেনু ইতিমধ্যে মুদ্রিত হওয়ায় এবং গ্রাহকের প্রত্যাশা বজায় রাখতে, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বর্তমান মূল্যে খাবার বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে। তবে গ্যাসের খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেনু পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়ছে।
এই পরিস্থিতি রেস্টুরেন্ট শিল্পের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। গ্যাসের উচ্চ দামের ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত মুনাফা হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে, সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসার পরিকল্পনা ও নগদ প্রবাহকে প্রভাবিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন, যদি গ্যাসের দাম ও সরবরাহের সমস্যা সমাধান না হয়, তবে রেস্টুরেন্টগুলোকে বিকল্প জ্বালানি বা গ্যাস সংরক্ষণ পদ্ধতি বিবেচনা করতে হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি নীতি বা সহায়তা প্যাকেজ প্রকাশিত হয়নি।
অন্যদিকে, BERC এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো গ্যাসের বাজার পর্যবেক্ষণ বাড়িয়ে তুলেছে। তারা দাবি করছে যে গ্যাসের সরবরাহে কোনো বড় বাধা নেই, তবে পাইকারি বিক্রেতাদের দামের অতিরিক্ততা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেস্টুরেন্ট মালিকদের মতে, গ্যাসের দাম স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত তারা খাবারের দাম বাড়াতে দ্বিধা করবে। মেনু পরিবর্তনের ফলে গ্রাহকের আস্থা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, তাই তারা বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সহ্য করার চেষ্টা করছে।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকার রেস্টুরেন্ট শিল্প LPG দামের উত্থান ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে আর্থিক চাপের মুখে। বাজারের স্বচ্ছতা ও সরকারী হস্তক্ষেপের অভাব ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম স্থিতিশীল না হলে রেস্টুরেন্টের কার্যক্রমে আরও বড় বাধা আসতে পারে।



